রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১০:২০ অপরাহ্ন
Title :
৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চায় ইরান: নতুন প্রস্তাব তেহরানের প্রাথমিকের সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাউকে বাদ দিচ্ছি না: শিক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা: তথ্যমন্ত্রী শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞের তদন্ত শেষ পর্যায়ে: চিফ প্রসিকিউটর ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড়! ডিএমপির তিন থানায় ওসিকে বদলি ট্রাফিক আইন ভাঙলেই যাবে অটো নোটিশ, জারি হতে পারে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ভক্তদের আরও কাছাকাছি আসতে ইউটিউব চ্যানেল খুললেন জয়া বিএনপি নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করতে চায়, সংস্কারে তাদের অনীহা: আখতার হোসেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রধান অন্তরায়: মালিকের স্বার্থ ও খণ্ডিত সত্য

বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা: তথ্যমন্ত্রী

  • Update Time : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬
  • ৫ Time View

বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত অধিকার সুরক্ষায় এক ঐতিহাসিক ঘোষণা এসেছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, দেশে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের জন্য সরকার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করছে। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানান।

রবিবার ৩ মে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সম্পাদক পরিষদ এবং নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা নোয়াব যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন, মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার, এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক এবং গণমাধ্যম মালিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন স্বীকার করেন যে, রাষ্ট্র বা সরকার নিজেই অনেক সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও সাহসের সাথে বলেন, গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

কারণ অনেক ক্ষেত্রে সরকার নিজেই একটি পক্ষ হয়ে যায় এবং অজান্তে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ করে ফেলতে পারে। যেখানে সরকারের ভুল করার সম্ভাবনা থাকে, সেখানে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন থাকা জরুরি, যা গণমাধ্যমের কর্মকাণ্ড তদারকি করবে এবং সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় রাখবে।

তথ্যমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের আধুনিক ও উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো ইতিমধ্যে এ ধরনের স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশেও গণমাধ্যমের বিকাশ এবং এর ভেতরে থাকা বিশৃঙ্খলা দূর করতে এই ধরনের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান সময়ের দাবি।

প্রস্তাবিত এই গণমাধ্যম কমিশন কীভাবে কাজ করবে এবং এর প্রাথমিক ধাপ কী হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা মন্ত্রী সভায় তুলে ধরেন। তিনি জানান, কমিশনের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার আগে প্রথম ধাপে একটি শক্তিশালী পরামর্শ কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটিতে দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম মালিক এবং সংশ্লিষ্ট অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতেই কমিশনের কার্যপরিধি ও আইনি কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।

এই কমিশনের প্রধান কাজ হবে গণমাধ্যম খাতের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তি করা।

বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বর্তমান সময়ের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রভাব এবং এর ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ। তথ্যমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল দুনিয়ার প্রসারের কারণে প্রচলিত গণমাধ্যম অর্থাৎ ছাপা পত্রিকা ও টেলিভিশন এখন অস্তিত্বের সংকটে।

বিশেষ করে ফেসবুক, গুগল বা ইউটিউবের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা অ্যালগরিদম ও বিজ্ঞাপনী নীতি দেশীয় গণমাধ্যমকে কোণঠাসা করে ফেলছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। কারণ এর মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্টদের হাতে। তাই জাতীয় পর্যায়ে এককভাবে এর সমাধান খুঁজে বের করা বেশ জটিল। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে কীভাবে একটি আইনি ও নৈতিক কাঠামোর আওতায় আনা যায় তা নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা নিয়েও মন্ত্রী কড়া সমালোচনা করেন। বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলের টার্গেট রেটিং পয়েন্ট বা টিআরপি এবং সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা বা সার্কুলেশন নির্ধারণের প্রচলিত পদ্ধতি নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে যে পদ্ধতিতে টিআরপি বা প্রচারসংখ্যা নির্ধারণ করা হয় তা অত্যন্ত সীমিত উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি অনেক সময় বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের পরিপন্থী। প্রস্তাবিত কমিশন এই মানদণ্ডগুলোকে আরও বিজ্ঞানসম্মত ও স্বচ্ছ করতে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যম মালিকদের উদ্দেশে বলেন, গণমাধ্যমকে কেবল মুনাফা অর্জনের ব্যবসা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সমাজের দর্পণ এবং রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম কারিগর। গণমাধ্যমের সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সরকার নীতিগত সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা করছে। তবে এর বিপরীতে গণমাধ্যমকেও নিজেদের দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে।

মন্ত্রী সরাসরি অনুরোধ জানান, গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা যেন যেকোনো গঠনমূলক সমালোচনা বা পরামর্শ সরাসরি সরকারকে জানান, যাতে করে একটি অবাধ তথ্যপ্রবাহের পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হয়।

সভার শুরুতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়াত হওয়া সাংবাদিকদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন এবং যারা বয়সের ভারে বা অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি এবং ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের সভাপতিত্বে সভায় দেশের শীর্ষ সংবাদপত্রের সম্পাদকরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী, দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ।

বক্তারা বলেন, গণমাধ্যম কমিশন গঠন যেন কোনোভাবেই সরকারি নিয়ন্ত্রণের নতুন হাতিয়ার না হয়। এটি যেন প্রকৃতপক্ষেই স্বায়ত্তশাসিত এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সেই নিশ্চয়তা সরকারকে দিতে হবে। এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা এর সমগোত্রীয় আইনগুলো যাতে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা না দেয় সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়।

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, সময়ের আলো ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, সংবাদ নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম এবং ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে তথ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি স্বাধীন প্রেস কাউন্সিল বা শক্তিশালী কমিশনের। সরকারের এই নতুন উদ্যোগ যদি সঠিক অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের মানবাধিকার রক্ষা, উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে

তথ্যমন্ত্রীর ভাষায়, আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই যেখানে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারবেন এবং সরকারও তার ভুল সংশোধন করে জনবান্ধব হয়ে উঠবে। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত এই পরামর্শ কমিটি কত দ্রুত তাদের কাজ শুরু করে এবং একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম কমিশন আলোর মুখ দেখে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category