দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংস্কার বনাম ক্ষমতার লড়াই এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের দাবি, অন্যদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত জনদেশকে কেবল ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সরাসরি তোপ দেগেছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বিরুদ্ধে। তাঁর মতে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও এখন ক্ষমতার বাহানায় বিএনপি সেই সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সুকৌশলে সরে দাঁড়াচ্ছে।
রোববার রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি (ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট) মিলনায়তনে জাতীয় নাগরিক পার্টি আয়োজিত ‘জাতীয় কনভেনশন’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব অভিযোগ করেন। আখতার হোসেনের এই বক্তব্য ২০২৬ সালের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আখতার হোসেন তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সরকারের মানসিকতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বিএনপি জনগণের রায়কে কেবল শাসন করার অধিকার হিসেবে দেখছে, রাষ্ট্র সংস্কারের আমানত হিসেবে নয়।
আখতার হোসেনের মতে, বিএনপি এখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করার নেশায় মত্ত। সংস্কার করলে তাদের ক্ষমতার পরিধি বা একক কর্তৃত্ব কমে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই তারা পিছিয়ে যাচ্ছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশে ইতোমধ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটের রায়ের পর কোনো রাজনৈতিক দল কীসে রাজি বা নারাজ, তা আর বড় বিষয় নয়। জনগণের আকাঙ্ক্ষাই এখন চূড়ান্ত হওয়া উচিত।
নির্বাচনের মাধ্যমে যারা প্রতিনিধি নির্বাচিত হন, তারা নিজেদের ‘জনগণের সেবক’ ভাবার বদলে ‘ক্ষমতার অধিকারী’ মনে করছেন। এই পুরোনো মানসিকতা থেকে বিএনপি বের হতে পারেনি বলে তিনি দাবি করেন।
দেশের চলমান সাংবিধানিক সংকট নিরসনে এনসিপি এবং বিএনপির মধ্যে যে দীর্ঘদিনের মতভেদ ছিল, তা আজ স্পষ্ট করেছেন আখতার হোসেন। সংবিধান পুনর্লিখন নাকি সংশোধন, এই প্রশ্নেই মূলত জোটের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, বর্তমান সংবিধান দিয়ে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। তাই একটি ‘গণপরিষদ’গঠন করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিএনপি শুরু থেকেই সংসদের ভেতরেই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে ছিল। এনসিপির অভিযোগ, এটি মূলত সংবিধানকে নিজেদের সুবিধামতো সাজিয়ে নেওয়ার একটি কৌশল মাত্র।
দুই বিপরীতধর্মী অবস্থানের কারণে যখন সংকট তৈরি হয়, তখন একটি মাঝামাঝি সমাধান হিসেবে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’গঠনের প্রস্তাবে দলগুলো একমত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিষদও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করেন আখতার হোসেন।
নির্বাচনের আগে ও পরের বিএনপির দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন রাজনৈতিক চাপে ছিল, তখন তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিল।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি জানত যে ‘না’ বললে তারা জনগণের সমর্থন হারাবে। তাই তখন তারা সংস্কারের পক্ষে ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর তারা ভাবছে জনগণ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। এটা তাদের ভুল ধারণা। জনগণ সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
আখতার হোসেন সতর্ক করে বলেন, জনগণ কেবল ভোট দিয়ে শান্ত হয়ে বসে নেই। সরকার ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য কতটা কার্যকর এবং টেকসই আইন প্রণয়ন করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে তাদের ভবিষ্যৎ জনপ্রিয়তা।
জাতীয় কনভেনশনে আখতার হোসেন স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় নাগরিক পার্টি কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যদি সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং কেবল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনীতিতে লিপ্ত হয়, তবে এনসিপি রাজপথে প্রতিবাদ গড়ে তুলবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে বর্তমান শাসন ব্যবস্থার যে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তা দূর না করলে দেশ আবার একটি গভীর সংকটে পড়তে পারে। টেকসই গণতন্ত্রের জন্য কেবল নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, বরং একটি সুসংহত সাংবিধানিক কাঠামো প্রয়োজন যা কোনো ব্যক্তি বা দল চাইলেই নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না।
আখতার হোসেনের এই কড়া সমালোচনা ২০২৬ সালের বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এটি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন জোটের ভেতরেও এখন আদর্শিক ও কৌশলগত ফাটল দেখা দিয়েছে। বিএনপির বিরুদ্ধে ‘ক্ষমতা ভোগ’ করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা যদি সত্যি হয়, তবে আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জনগণ এখন তাকিয়ে আছে সরকার এবং বিরোধী পক্ষগুলোর দিকে। সংস্কারের যে স্বপ্ন দেখিয়ে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ পায় নাকি কেবল ‘ক্ষমতার বাহানায়’ হারিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
জনগণই চূড়ান্ত বিচারক, আর তাদের পর্যবেক্ষণের বাইরে কোনো রাজনৈতিক চালই শেষ পর্যন্ত সফল হবে না, আইডিইবি-র মঞ্চ থেকে এই বার্তাই দিয়েছেন আখতার হোসেন।