হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের সাম্প্রতিক মহাবিপর্যয় এবং মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হওয়া কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি ভুল কৃষি নীতি ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে সৃষ্ট একটি ‘মানুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ’।
মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘নয়াকৃষি আন্দোলন’ ও ‘উবিনীগ’ (উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা) এই সভার আয়োজন করে।
‘হাওরে বোরো ধান বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন: করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক সভায় জানানো হয়, গত ৮ মে ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগাম ও অতিবৃষ্টিতে হাওরের প্রায় ৪৯,০৭৩ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৩৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বক্তারা বলেন, দেশের মোট বোরো উৎপাদনের ২০ শতাংশ হাওর থেকে এলেও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এই অঞ্চলকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
সভার সভাপ্রধান ও অন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “একসময় হাওরে সেচ ছাড়াই স্থানীয় জাতের ধান চাষ হতো। কিন্তু এখন কৃষকদের সার ও বিষ নির্ভর ব্রি-২৮ বা ব্রি-২৯ চাষে বাধ্য করা হচ্ছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়েছে। এছাড়া কাদা ও পানিতে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিনগুলো এবারের দুর্যোগে কোনো কাজেই আসেনি।”
সভায় হাওরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কড়া সমালোচনা করে বক্তারা তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করেন:
অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক: কিশোরগঞ্জের ‘অলওয়েদার রোড’ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত ৩১১টি বাঁধ পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।
মৎস্যসম্পদ ধ্বংস: বোরো ধানে ব্যবহৃত কীটনাশক পানিতে মিশে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। ফলে গত দশকে মাছ আহরণ প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন কমে গেছে।
শ্রমিক সংকট: যান্ত্রিকীকরণের ফলে অন্য জেলা থেকে শ্রমিক আসা বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় যন্ত্র বিকল হলে উচ্চ মজুরি দিয়েও শ্রমিক না পাওয়ায় কৃষক ধান ঘরে তুলতে পারছেন না।
আলোচনা শেষে হাওর রক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ব্রি’র সাবেক মহাপরিচালক জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস, বিএডিসির গবেষণা সেলের প্রধান ড. নাজমুল ইসলাম, গবেষক পাভেল পার্থ এবং বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলমসহ বিভিন্ন জেলার কৃষক প্রতিনিধিরা।