রাজধানীতে দিনদুপুরে গুলিতে নিহত পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে উত্তেজনা ময়নাতদন্তে বেরিয়ে এসেছে একাধিক আঘাত ও গুলির চিহ্ন।
রাজধানীর মিরপুরে সোমবার সন্ধ্যায় প্রকাশ্যে গুলিতে প্রাণ হারানো যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়ার (৩৬) মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য থামছে না।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের একটি দোকানে ঢোকার পরপরই কয়েকজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। মুহূর্তেই কিবরিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনার সময় দোকানে কাজ করা কয়েকজন কর্মচারী ও আশপাশের লোকজন আতঙ্কে দিকবিদিক ছুটোছুটি শুরু করেন।
মঙ্গলবার সকালে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. নাশাত জাবিন জানান, কিবরিয়ার শরীরে মোট ১৮টি ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব ক্ষতের বেশির ভাগই গুলির আঘাত এবং কিছু আঘাত পাশ্ববর্তী টিস্যুতে চেপে ধরার বা ছিটকে পড়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা চিকিৎসকদের।
ডা. জাবিন আরও বলেন, মৃত্যু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ফলেই হয়েছে। ক্ষতগুলোর প্রকৃতি দেখে বোঝা যায়, হামলাকারীরা খুব কাছ থেকে লক্ষ্যভেদীভাবে গুলি করেছে।
ময়নাতদন্ত শেষে কাগজপত্র হাতে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের কান্না আরও বেড়ে ওঠে। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে শোকের ভারী আবহ নেমে আসে।
কিবরিয়ার পরিবারের সদস্যরা জানান, হত্যার পেছনে রাজনৈতিক শত্রুতা, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা জনপ্রিয়তার ঈর্ষা কোনো কারণই তারা উড়িয়ে দিতে নারাজ। কিবরিয়া এলাকায় পরিচিত রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। স্থানীয়ভাবে দলীয় কার্যক্রম ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে তার ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবারের মতে, ঠিক এই জনপ্রিয়তাই কারও কারও জন্য বিরক্তির কারণ ছিল।
কিবরিয়ার ছোট ভাই বলেন, আমরা কাউকে দায়ী করছি না, আবার কাউকে সন্দেহের বাইরে রাখতেও পারছি না। আমাদের ভাইয়ের মৃত্যুর কারণ খুব পরিকল্পিত মনে হয়েছে। এমন টার্গেটেড হামলা একদিনে সিদ্ধান্ত হয় না।
পরিবারের লোকজন দ্রুত মামলা গ্রহণ এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ সকল তথ্য কাজে লাগিয়ে হত্যাকারীদের শনাক্তের দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার সময় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার একজন চালকও গুলিবিদ্ধ হন। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হামলাকারীরা গুলি ছুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ভয়ে লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই চালকটি গুলিবিদ্ধ হন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর থেকেই পল্লবীর বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা বলছেন, দিনদুপুরে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তারা আতঙ্কিত। অনেক দোকানপাট রাতের আগেই বন্ধ হয়ে যায়। এলাকাজুড়ে পুলিশের অতিরিক্ত টহল চলছে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, ভিডিও দেখে মনে হয়েছে, যারা গুলি করেছে তারা খুবই ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করেছে। তারা ভয় বা দৌড়াদৌড়ি না করে খুব হিসাব করে গুলি ছুড়েছে।
পল্লবী থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ চলছে। এখনই হামলাকারীদের পরিচয় বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু বলা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, পরিবার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করলে মামলা গ্রহণ করা হবে।
পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিডিও সংগ্রহ, গুলির খোসা উদ্ধার ও আশেপাশের দোকানিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
কিবরিয়া যুবদলের একজন সক্রিয় সংগঠক হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। দলীয় নেতারা এটিকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে দ্রুত বিচারের দাবি তুলেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো কোনো গ্রেপ্তার বা নাম প্রকাশ করেনি।
চারদিকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই এত ঘৃণ্য ও নিখুঁতভাবে সংগঠিত হামলার উদ্দেশ্য কী? এমন ব্যবধানে এবং এমন কাছ থেকে গুলি চালানোর পেছনে কারা ছিল?
পরিবারের সদস্যরা বলেন, আমরা শুধু চাই, যারা আমাদের ভাইকে হত্যা করেছে তাদের আইনের মুখোমুখি আনা হোক। কিবরিয়া কাউকে কষ্ট দেননি। তিনি বেঁচে থাকলে আরও অনেক মানুষের উপকার করতেন।
ময়নাতদন্তের ভয়াবহ তথ্য, সিসিটিভিতে ধরা পড়া দৃশ্য এবং পরিবারের কান্না সব মিলিয়ে কিবরিয়া হত্যাকাণ্ড এখন রাজধানীর নতুন এক রহস্যে পরিণত হয়েছে। তদন্তে নতুন অগ্রগতি না আসা পর্যন্ত স্বজনদের অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস আরও বেড়েই চলেছে।