শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

দ্বৈত রাজনীতির দ্বন্দ্বে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটি- মাহবুবুল কারীম সুয়েদ

  • Update Time : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬
  • ৪৭ Time View

একটা সময় বিলেতে যেইসব বৃটিশ বাংলাদেশিরা মুলধারার রাজনীতির সাথে জড়িত থাকতেন বিশেষ করে কাউন্সিলর বা অন‍্যকোম গুরুত্বপুর্ন পদে থাকাবস্থায় বাংলাদেশী রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতেন না।দেখা যেত অনেকেই বাংলাদেশী দলীয় রাজনীতি তথা বিএনপি-জামায়াত বাঁ আওয়ামী লীগের ভক্ত অথবা সমর্থক কিন্তু মুলধারার রাজনীতির সাথে জড়িত বিধায় তারা দেশীয় রাজনৈতিক কর্মসূচির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত বা উপস্থিত হতেননা।বুদ্বিবৃত্তিক বা পেছন থেকে তারা পছন্দের রাজনৈতিক দল বা গুষ্টিকে সমর্থন করতেন।কিন্তু বিগত বছর দুয়েক ধরে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু বৃটিশ বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ যারা বিলেতে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন তারা পদে থাকাবস্থায় বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের সাথে সক্রিয় হয়ে কাজ করছেন।

বিগত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে বৃটেনের অন্তত ৫ জন বর্তমান কাউন্সিলর দেশে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেছেন যা নিয়ে গার্ডিয়ানের মত প্রভাবশালী দৈনিকও নিউজ করেছিলো। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে ৩১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে স্পাইকড ম্যাগাজিনে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দ্য গার্ডিয়ান এবং ১৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে লোকাল গভর্নমেন্ট লইয়ার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের কয়েকজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কাউন্সিলরের বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রচেষ্টা নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।পত্রিকাগুলোর সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ‍্যা গার্ডিয়ান তাদের ১৩ নভেম্বর ২০২৫ এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের কয়েকজন নির্বাচিত কাউন্সিলর বাংলাদেশে সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় যুক্তরাজ্য সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের কমিউনিটিজ সেক্রেটারি স্টিভ রিড বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন এবং টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের তত্ত্বাবধায়কদের সঙ্গে বৈঠক আহ্বান করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার উদ্যোগ এমন সময়ে এসেছে যখন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে আগেই সরকারি পর্যায়ে উদ্বেগ ছিল। ফলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রশ্ন নয়, বরং স্থানীয় শাসনব্যবস্থা ও জনআস্থার সঙ্গেও জড়িত।

তাছাড়া লোকাল গভর্নমেন্ট লইয়ারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিলর সাবিনা খান ও ওহিদ আহমেদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, যদিও তারা তখনও লন্ডনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ঘটনায় যুক্তরাজ্যের কমিউনিটিজ সেক্রেটারি স্টিভ রিড ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় জনগণের সেবা করার জন্য নির্বাচিত কোনো কাউন্সিলর অন্য দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়াকে তিনি “হতাশাজনক” ও “অগ্রহণযোগ্য” মনে করেন। তবে প্রতিবেদনে এটিও উল্লেখ করা হয় যে, যুক্তরাজ্যের বিদ্যমান আইনে বিদেশে নির্বাচনে অংশ নেওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউন্সিলরের পদ হারানোর কারণ নয়।

খোজ নিয়ে দেখা যায়, বিলেতে অর্জিত মুলধারার রাজনীতি পদকে সিড়ি হিসেবে ব‍্যবহার করে দেশীয় রাজনীতিতে সাফল‍্য প্রাপ্তির এই প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না বিলেতে বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে সক্রিয় থাকা বিভিন্নজন।কমিউনিটির নানা বিষয়ে সক্রিয় থাকা বিভিন্নজনের সাথে আলাপে জানা যায়, এই প্রক্রিয়া ব‍্যক্তি হিসেবে তাদের জন‍্যে লাভজনক হলেও সামগ্রিকভাবে গোটা কমিউনিটির জন‍্যে ক্ষতিকর।গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিউজের সুত্রধরে কয়েকজন জানান, এইসব ব‍্যক্তির এমন রাজনৈতিক ভুমিকায় এখানে সক্রিয় আমাদের ৪র্থ প্রজন্মের তরুন রাজনীতিবিদরাও নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হয় এবং অনেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে সেই সম্ভাবনাও রয়েছে।

তথ‍্য নিয়ে দেখা গেছে, শুধু গেলো সংসদ নির্বাচনেই শেষ হয়নি বরং এর রেশ চলমান রয়েছে।বর্তমানে যুক্তরাজ্যে সফররত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের সহ-সভাপতি আবু সাদিক কায়েমের ভ্রমণ উপলক্ষে বেশ কিছু কাউন্সিলের বর্তমান কাউন্সিলর সক্রিয়ভাবে থেকে তাদের স্বাগত জানানোর সভা সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন।কেউ কেউ শুধু রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছেন না বরং প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে সোশ‍্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্নভাবে নিজেদের জানান দিচ্ছেন।বাংলাদেশী রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠার এই প্রবণতা আগে পুর্ব লন্ডন কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ থাকলেও এর বিস্তার ঘটছে ইদানীং।সাংসদ হাসনাত ও শিবির নেতা সাদিকের আগমনকে কেন্দ্র করে লন্ডনের বাইরে অন‍্য শহরের জনপ্রতিনিধিদের ভুমিকা চোখে পড়েছে।

এমনিতে লজ্জা লাগে এখানে থেকে দেশের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিকারী দলগুলোর কর্মীদের জন‍্যে।অতীতে আমরা দেখেছি যখনই বাংলাদেশ থেকে সরকার প্রধান বিলেতে এসেছেন সাথে সাথে বিরোধীরা তাঁর থাকার স্থানের সামনে বা মিটিংয়ের জায়গায় গিয়ে ডিম মারা থেকে ধস্তাধস্তি সবই করতেন।সেই পরিস্থিতির বিস্তৃতি আরো ঘটেছে এবার।একজন সাংসদ ও একজন ছাত্রনেতার আগমনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার শহর অক্সফোর্ডে উভয় প্রতিদ্বন্দ্বী দলের লোকদের যুদ্বাংদেহী মিছিল-স্লোগান-ধস্তাধস্তি আমাদের আশাহত শুধু করেনি বরং লজ্জিত করেছে।পুর্ব লন্ডনে তো দেখলাম ৩/৪ জনকে পাঁজাকোলে করে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে।এই প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছিলাম দেশের এক সময়ের ছাত্রনেতা ও যুক্তরাজ্যে মুলধারার সক্রিয় রাজনীতিবিদ ওহিদ আহমদের কাছে।

তিনি বলেন, “আমার কথা হলো যারা যুক্তরাজ্যে বা অন্য যেকোন উন্নত দেশে সিস্টেমে কাজ করেছে, অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে দেশে গিয়ে একটি সৎ, দক্ষ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে অবদান রাখতে চায়—তাদের জন্য পথটা সহজ করা উচিত।
এটা শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, দেশের জন্যও উপকারী। কারণ উন্নত গণতন্ত্রে কাজ করা মানুষের অভিজ্ঞতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে একই সঙ্গে আমি মনে করি, একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য নীতিমালা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নীতিমালা থাকলে কেউ ভুল ব্যাখ্যার শিকার হবে না, এবং কমিউনিটির ভাবমূর্তিও অক্ষুণ্ণ থাকবে। অর্থাৎ অভিজ্ঞ মানুষদের অবদান রাখার সুযোগ দিতে হবে, আর সেই সুযোগ যেন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—এটাই দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো।”

লন্ডনের স্বনামধন্য আইনজীবী ও টাওয়ার হেমলেটস কাউন্সিলের সাবেক স্পিকার সাবেক কাউন্সিলর ব‍্যারিষ্টার সাইফুদ্দীন খালেদের কাছে প্রশ্ন ছিল “আপনি কি মনে করেন, একজন নির্বাচিত ব্রিটিশ কাউন্সিলরের একই সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া উচিত? সমালোচকদের মতে, এতে স্থানীয় জনগণের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ও অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আপনি কি এই উদ্বেগকে যৌক্তিক মনে করেন, নাকি এটিকে প্রবাসীদের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখেন?

আমার প্রশ্নের জবাবে ব‍্যারিষ্টার খালেদ তার উত্তরে বলেছেন “আমার মতে, একজন নির্বাচিত ব্রিটিশ কাউন্সিলরের বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে আগ্রহ বা অংশগ্রহণ করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সমস্যা নয়। প্রবাসী নাগরিকদেরও তাদের জন্মভূমির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে মত প্রকাশ এবং অংশগ্রহণের গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে।

তবে সমালোচকদের উদ্বেগকেও পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা যায় না। একজন নির্বাচিত কাউন্সিলরের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব করা। যদি তার সময়, মনোযোগ বা রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এমনভাবে বিভক্ত হয় যে স্থানীয় জনগণ মনে করেন তারা যথাযথ প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছেন না, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

সুতরাং বিষয়টি মূলত দ্বৈত সম্পৃক্ততার নয়, বরং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতার। একজন কাউন্সিলর যদি তার স্থানীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়েও সক্রিয় থাকেন, তাহলে আমি এটিকে প্রবাসীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ হিসেবে দেখব। কিন্তু যদি স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সমালোচনাগুলো অবশ্যই যৌক্তিক হয়ে ওঠে।”

আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ ‍যারাই এই দেশে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন বা নির্বাচিত হয়ে আছেন কোন পদে দয়া করে পদে থাকাবস্থায় বাংলাদেশী রাজনীতির অংশ হয়ে আমাদের বদনামের অংশীদার করবেন না।আমরা কারো দেশপ্রেম বা নিজ দেশের জন‍্যে কাজ করার আগ্রহকে খাটো করে দেখার পক্ষপাতী নই কিন্তু এমনটি করার আগে এই দেশে ধরে রাখা পদ থেকে ইস্তফা দিন অথবা এর মেয়াদ পুর্ণ হবার পর বাংলাদেশী রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় হোন।
লেখক- যুক্তরাজ‍্য প্রবাসী।

Email- mksuyed@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category