মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৬:০৪ অপরাহ্ন

মধ্যপ্রাচ্যে দশক পুরোনো কালো অধ্যায় সমাপ্তির সূচনা

  • Update Time : রবিবার, ১২ মার্চ, ২০২৩
  • ২৮০ Time View

সৌদি  আরব এবং ইরানের বৈরিতার ইতিহাস ৪০ বছরের বেশি পুরোনো। চীনের মধ্যস্থতায় দেশ দুটি যখন চুক্তি করে মৈত্রীর পতাকা তুলে নিয়েছে, তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেয়ার মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করেছে। এ চুক্তি একদিকে তেলসমৃদ্ধ এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে; অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে দশক পুরনো কালো অধ্যায় সমাপ্তির পথ খুলে দিয়েছে।

আশ্চর্যজনক হলেও সৌদি-ইরান চুক্তি যেন প্রত্যাশিত ছিল। আঞ্চলিক এ দুই শক্তি প্রায় দুবছর ধরে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। একটা সময় মনে হয়েছিল, এ আলোচনা সফল হবে না; দেশ দুটির মধ্যে গেড়ে বসা অবিশ্বাসের অচলাবস্থা কোনোদিনও কাটবে না। কিন্তু  গত শুক্রবার (১০ মার্চ) দেশ দুটির মধ্যে মৈত্রী চুক্তি হওয়ায় সেই শঙ্কার মেঘ কেটে উঁকি দিয়েছে সফলতার সূর্য।

সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে আলোচনা শুরু হয় মূলত ২০১৬ সালে। যে সময়টায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় জাতির মধ্যে শুরু হয় পরমাণু আলোচনা। ধারণা করা হচ্ছিল, রিয়াদ-তেহরান আলোচনা মূলত ওয়াশিংটনের কারিগরি।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে। এক সময়ের সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন চলছে খুবই ধীরগতিতে। আগের সে ঊষ্ণতা আর নেই। পক্ষান্তরে বর্তমানে গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই চীনের প্রভাব আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ওয়াশিংটন যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে চলমান বৈরিতা দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে চীন দেখিয়েছে সফলতা। এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে দারুণ কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে বেইজিং। তাছাড়া অতি অবশ্যই তারা তথাকথিত পশ্চিমা মানবাধিকারের সবক দেয়ার চেষ্টা করেনি দেশগুলোকে।

সৌদি আরব ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পুরস্কার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়েছিল। কিন্তু চীনের বেলায় তেমন কোনো শর্তাবলী তারা হাজির করেনি। ফলে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটনের প্রভাব কমিয়ে নিজের প্রভাব বাড়ানোর জন্য এ চুক্তির মধ্যস্থতা করাটা বেইজিংয়ের কাছে ছিল একেবারে স্বেচ্ছাসেবার মতো। আর এতে কাজও হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি শুক্রবার টুইটে বলেছেন, ‘যদিও ওয়াশিংটনে অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের উদীয়মান ভূমিকাকে হুমকি হিসেবে দেখবে। তবে বাস্তবতা হলো, আরও স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য যেখানে ইরান এবং সৌদি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই আশীর্বাদস্বরূপ।’
রক্তাক্ত কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি
চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান এ ‍চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ করতে পারে। ১৯৭৯ সালে ইরানে পশ্চিমাবিরোধী ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান-সৌদি আরবের মধ্যে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। তা আবার এ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। অবশেষে সেই দ্বন্দ্ব শেষ হওয়ার একটি উপায় সামনে এসেছে।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর দুপক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এ অঞ্চলে একাধিক প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত জঙ্গিদের সশস্ত্র সংঘাত পরবর্তী দেড় দশকে এ অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশকেই রক্তাক্ত করে তোলে।
যেমন ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযান বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের সূত্রপাত করেছে। ইরান সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সমর্থন করে; বিপরীতে সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ সমর্থন দেয় বিদ্রোহীদের। লেবাননেও ইরান এবং সৌদি আরব ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করেছে, যা দেশটির রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৬ সালে সৌদি আরব দেশটির রাজতন্ত্রবিরোধী শিয়া নেতা নিমর আল-নিমরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। জবাবে ইরানে বিক্ষোভকারীরা সৌদি দূতাবাস জ্বালিয়ে দেয়। প্র্রতিক্রিয়ায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব। তবে কোভিড মহামারি এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে দুই দেশর সংঘাত সৃষ্টির ইচ্ছা কমতে বাধ্য হয়। সৌদি এবং ইরানি কর্মকর্তারা বলতে বাধ্য হন যে, তারা সেই রক্তাক্ত কালো অধ্যায়টি বদলে দিতে আগ্রহী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান চুক্তি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়টিকে ছাড়িয়েও আরও গভীরে পৌঁছে গেছে বলে মনে হচ্ছে। সৌদি ও ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা দশক পুরনো নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তিকে পুনরায় বাস্তবায়ন করতে চান এবং প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তারা পুরনো চুক্তিগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে কাজ করবেন। তবে চুক্তিটি কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো দেখার বাকি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইরান এবং সৌদি আরব দুই দেশকেই চুক্তির মাধ্যমে লাভবান হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। ফলে পশ্চিমা মূলধনসমৃদ্ধ এ অঞ্চলে আগের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই পাল্টে গেছে।

এ বিষয়ে সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলী শিহাবী সিএনএনকে বলেছেন, ‘চীন এখন চুক্তির গডফাদার এবং চীন ইরানকে যে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দিয়েছে তার ওজন অনেক। ফলে, ইরান যদি এ চুক্তি ভেঙে দিতে চায়, তবে তা এ ত্রিপাক্ষিক চুক্তির অমার্যাদা করবে এবং চীন-ইরান সম্পর্ককে আঘাত করবে। ইরান নিশ্চয়ই তা চাইবে না।’


(সিএনএন থেকে সংক্ষেপিত)

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category