বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এমন মন্তব্য করেছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা।
বলেন, পুলিশ যদি ‘আওয়ামী পুলিশ’ বা ‘বিএনপি পুলিশ’ নামে পরিচিত হয়, তাহলে সেই বাহিনী দিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ পুলিশের সংস্কার: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।
বৈঠকটির আয়োজন করে দৈনিক প্রথম আলো ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার কল্যাণ সমিতি।
নিজের দীর্ঘ পেশাজীবনের অভিজ্ঞতা টেনে নুরুল হুদা বলেন, দুই সরকারপ্রধানের সময় কাজ করেছি। দেখা করতে গেলে অনেক সময় শুনেছি‘এই অফিসার কি আমাদের?’ এই ধরনের প্রশ্ন একজন কর্মকর্তার জন্য খুব বিব্রতকর।
তার মতে, প্রশাসনে ও পুলিশে এখনো আমার লোক তোমার লোক সংস্কৃতি জেঁকে বসে আছে, যা পেশাদারিত্বকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগ ও পদোন্নতির ধারা পরিবর্তন হয়, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নীতিকে দুর্বল করে।
নুরুল হুদা বলেন, অনেকেই টাকা-পয়সা দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করছে। যখন নিয়োগেই দুর্নীতি ঘটে, তখন দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা আশা করা যায় না।
তিনি আরও যোগ করেন, সমাজের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান বিভাজনও পুলিশের নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবেশকে সংকুচিত করছে।
যে সমাজে আমরা কাজ করি, সেটিই যদি বিভক্ত হয়, তাহলে আইন প্রয়োগকারীর কাজ অনেক কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান তিনি।
সাবেক এই আইজিপি বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরও পুলিশ আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি, যা হতাশাজনক। তিনি জানতে চান, স্বাধীন পুলিশ কমিশন কীভাবে কাজ করছে, তাদের সংস্কার প্রস্তাব কতটা বাস্তবায়নযোগ্য।
এ ছাড়া তিনি পুলিশ রিমান্ড প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, রিমান্ড অনেক সময় তদন্ত নয়, বরং ভয় প্রদর্শনের অস্ত্র হয়ে ওঠে। এটি পুনর্মূল্যায়ন দরকার।
বৈঠকে অংশ নেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, আইজিপি বাহারুল আলম, অধ্যাপক শাহনাজ হুদা, মানবাধিকারকর্মী নূর খান, এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির সভাপতি এম আকবর আলী।
রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস ও এনসিপি নেতারা।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান।
আলোচনায় একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি ইয়াসমিন গফুর।
বৈঠকের অংশগ্রহণকারীরা একমত হন পুলিশের পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার অপরিহার্য।
তারা বলেন, কেবল বাহিনীর পোশাক বা লোগো বদলালেই সংস্কার হয় না; বদলাতে হবে মানসিকতা ও সংস্কৃতি।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদার মতে, একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। দলীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসাই এখন পুলিশের সবচেয়ে বড় সংস্কার।