সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১০:১০ অপরাহ্ন

তিন বছর ধরে ফ্রান্সে বাংলাদেশি নারীদের ভাষা শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তায় ‘উইথ দ্য মাইন্ড’

  • Update Time : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
  • ২ Time View
ফ্রান্সে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, ফ্রান্স: ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের ভাষা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সামাজিক ও পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ তাদের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে ফরাসি ভাষা শিক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী নারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিয়েছে।

রোববার (২৮ জুন) প্যারিসের অদূরে পন্তা এলাকার একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি জাহরিন হক নুপুর।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’-এর তিন বছরের কার্যক্রম, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, ২০২৩ সালের জুন মাসে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি নারীর উদ্যোগে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার এক বছর পর এটি ফরাসি সরকারের স্বীকৃত নিবন্ধিত অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। এরপর থেকে সংগঠনটি নিয়মিতভাবে প্রবাসী বাংলাদেশি নারীদের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে ভাষা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

সভাপতি জাহরিন হক নুপুর বলেন, “প্রবাসজীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ভাষা। ভাষা না জানার কারণে অনেক নারী ঘরবন্দি হয়ে পড়েন, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং সমাজের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না। আমরা সেই বাধাগুলো দূর করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ শুরু করেছি।”

তিনি জানান, বর্তমানে সংগঠনটির অনলাইন ফরাসি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমে ৪৫০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নারী অংশগ্রহণ করছেন। এ পর্যন্ত সংগঠনের সহযোগিতায় ৬২ জন নারী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফরাসি ভাষার ডিপ্লোমা পরীক্ষা টিসিএফ ও ডেল্ফ- এ সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাশাপাশি দুই শতাধিক নারী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও সহায়তা গ্রহণ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ভাষা শেখানো নয়, বরং নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং তাদের সামাজিকভাবে আরও সক্রিয় করে গড়ে তোলা।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একমাত্র নারী কাউন্সিলর তানিয়া তুনু বলেন, “ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের জন্য ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ একটি অনন্য উদ্যোগ। ভাষা শিক্ষা, প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সংগঠনটির ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমি আশা করি, তাদের এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে।”

ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (এফবিজেএ)-এর সদস্য ও সাংবাদিক সরদার হাসান ইলিয়াছ তানিম বলেন, “বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয়ের পরিবর্তে প্রবাসী নারীদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। ভাষা শিক্ষা ও আত্মউন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশি নারীদের এগিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।”

অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা পাওয়া শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। ভাষা শিক্ষায় সফল কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

সম্প্রতি বি১ স্তরের ফরাসি ভাষার ডিপ্লোমা অর্জনকারী শিক্ষার্থী আসমা আক্তার রুপু বলেন, “প্রবাসে নতুন জীবন শুরু করতে ভাষা শেখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ শুধু ভাষা শেখায়নি, বরং আমাদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। আজ আমি নিজের সক্ষমতার ওপর অনেক বেশি বিশ্বাস করি।”

আরেক শিক্ষার্থী উম্মে সালমা বলেন, “অনেকবার মনে হয়েছে আর পারব না। কিন্তু সংগঠনের আপুদের আন্তরিক সহযোগিতা ও উৎসাহ আমাকে বারবার নতুন করে শুরু করার সাহস দিয়েছে। আজ আমি যে অবস্থানে পৌঁছেছি, তার পেছনে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’-এর বড় অবদান রয়েছে।”

আয়োজকরা জানান, সংগঠনটির সব ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে নিয়মিত গেট-টুগেদার, কর্মশালা, সচেতনতামূলক সেমিনার এবং পারিবারিক পিকনিকের আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রবাসী নারীদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমানো এবং মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে জানানো হয়, আগামী দিনে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত আরও বেশি বাংলাদেশি নারীকে ভাষা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন নতুন শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচিও চালু করা হবে।

অনুষ্ঠানে কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আশরাফুল ইসলাম, ডা. হাবিবা জেসমিন, সাংবাদিক ফয়সাল আহমেদ দ্বীপ, সাংবাদিক ফেরদৌস করিম আখঞ্জী, তরুণ পেশাজীবী দিয়ান আশরাফ, পেশাজীবী ইয়াসমিন নাজু, সাংবাদিক মুমিন আনসারী, উইথ দ্য মাইন্ড-এর ট্রেজারার ফারজানা নুপুর এবং সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম রনি, বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category