মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন

ট্রাম্প–শি জিনপিং বৈঠকের আগেই সমঝোতা কাঠামোতে একমত দুই দেশ

  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৮ Time View

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অবশেষে বাণিজ্যযুদ্ধ প্রশমনের পথে একটি সমঝোতা কাঠামোতে পৌঁছেছে। এই সমঝোতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, আলোচনায় দুই দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সমঝোতায়” পৌঁছেছে। এর আওতায় টিকটকের মার্কিন শাখা নিয়ে চূড়ান্ত সমাধান, চীনের বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে সাময়িক স্থগিতাদেশ, এবং মার্কিন সয়াবিন আমদানি পুনরায় শুরু করার মতো সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বেসেন্ট মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস-কে বলেন, ‘দুই দেশের নেতাদের বৈঠকে এই কাঠামো অনুমোদন পেলে, নতুন করে কোনো শুল্ক আরোপের আশঙ্কা থাকবে না।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উভয় পক্ষ “নিজ নিজ উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে মৌলিক ঐকমত্যে’ পৌঁছেছে এবং “চূড়ান্ত বিস্তারিত নির্ধারণে’কাজ করছে।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্ব বাণিজ্যে একের পর এক শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষার যুক্তি দেখিয়ে ট্রাম্প ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়া পর্যন্ত একাধিক দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক চাপানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে সবচেয়ে বেশি চাপ এসেছে চীনের ওপর। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, নভেম্বর থেকে চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করে, যা মার্কিন প্রযুক্তি শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা।

বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাত করে চীন, যা সৌর প্যানেল থেকে শুরু করে স্মার্টফোন, ইলেকট্রনিক চিপ—সব ক্ষেত্রেই অপরিহার্য। এ কারণেই এই খনিজ বাজার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে নতুন আলোচনার ফলে চীন আপাতত এক বছরের জন্য রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসেন্ট।

বাণিজ্যযুদ্ধের শুরুতেই চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন মার্কিন কৃষকেরা। বেসেন্ট নিজেকে ‘একজন সয়াবিন কৃষক’ উল্লেখ করে বলেন, আমাদের কৃষকদের উদ্বেগ আমরা সমাধান করেছি। নতুন চুক্তি ঘোষণা হলে তারা খুব দ্রুতই ইতিবাচক প্রভাব দেখবেন।

চুক্তি বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এটি হবে বড় অর্থনৈতিক স্বস্তি।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল টিকটক নিয়ে মার্কিন নিরাপত্তা উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে চাইছিল, জনপ্রিয় এই ভিডিও অ্যাপের মার্কিন কার্যক্রম যেন চীনা মালিকানা থেকে আলাদা হয়।

অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট জানান, টিকটকের মার্কিন ইউনিট নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা ট্রাম্প ও শি জিনপিং বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন।

চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন কোম্পানিগুলো টিকটকের অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সাত সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে ছয়জন থাকবেন মার্কিন নাগরিক। ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে টিকটক ব্যবহার করেছিলেন, ফলে তিনি এখন এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি আরও নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন।

দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে একাধিক নতুন বাণিজ্য চুক্তি এবং থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে কাঠামোগত সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিরল খনিজ ও কৌশলগত ধাতু সরবরাহে চীনের বিকল্প উৎস তৈরি করছে।

ভিয়েতনামের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৮০০ কোটি ডলারের বোয়িং জেট ক্রয় ও মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি।

মালয়েশিয়ায় এক বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা স্পষ্ট — আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি শতভাগ। বহু প্রজন্ম ধরে আমরা দৃঢ় অংশীদার হিসেবে থাকতে চাই।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন সমঝোতা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র–চীন বাণিজ্যযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করবে। একদিকে দুই দেশই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি এই দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প–শি জিনপিং বৈঠক তাই শুধু দুই দেশের নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category