ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বিশেষ বাহিনীর আকস্মিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশটিতে তৈরি হওয়া প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণে এক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।
স্থানীয় সময় শনিবার রাতে ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি তানিয়া ডি’অ্যামেলি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক ভাষণের মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে, ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এখন থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব পালন করবেন।
বিচারপতি তানিয়া তাঁর ভাষণে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর পক্ষে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা ‘ভৌতিক ও বস্তুগতভাবে অসম্ভব’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সংবিধানের বিধি মোতাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টকেই এই গুরুভার বহন করতে হবে।
১. সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আদালতের রায়
ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী, যখনই কোনো প্রেসিডেন্ট তাঁর দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ বা সাময়িকভাবে অসমর্থ হন অথবা অনুপস্থিত থাকেন, তখন সেই পদের উত্তরাধিকারী হন ভাইস প্রেসিডেন্ট। সুপ্রিম কোর্ট সেই সাংবিধানিক ধারাকেই বর্তমান সঙ্কটে প্রয়োগ করেছে। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে:
প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা: রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিলম্বে রদ্রিগেজকে ক্ষমতা গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিরক্ষা সমন্বয়: বর্তমান সামরিক আগ্রাসনের মুখে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নেতৃত্ব দেবেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট।
২. কে এই ডেলসি রদ্রিগেজ?
৫৬ বছর বয়সী ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে মাদুরোর ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত। তিনি একই সাথে দেশটির তেল মন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে তিনি দীর্ঘকাল ধরে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ এবং অর্থনীতি সামলে আসছেন। ২০১৮ সাল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই তুখোড় নারী রাজনীতিক এখন হোয়াইট হাউসের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হলেন।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের ‘চোখ রাঙানি’ বনাম কারাকাসের প্রতিরোধ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং অদূর ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনই দেশটি পরিচালনা করবে। তবে ট্রাম্পের এই ‘চোখ রাঙানি’ উপেক্ষা করে ডেলসি রদ্রিগেজ তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “মাদুরো আমাদের একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট। ওয়াশিংটন যা করেছে তা আন্তর্জাতিক আইনের চূড়ান্ত লঙ্ঘন।
তিনি বিশ্ববাসীর কাছে মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের, ‘বেঁচে থাকার প্রমাণ’ দাবি করেছেন। রদ্রিগেজ ঘোষণা করেছেন যে, ভেনেজুয়েলা কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করবে না এবং জনগণকে সাথে নিয়ে এই ‘আগ্রাসন’ প্রতিহত করবে।
৪. বর্তমান পরিস্থিতি: কারাকাস ও ওয়াশিংটনের লড়াই
মাদুরোকে যখন নিউইয়র্কে মার্কিন হেফাজত বা ডিইএ (ডিইএ) কর্মকর্তাদের সামনে হাজির করা হয়েছে, ঠিক তখনই কারাকাসে ডেলসি রদ্রিগেজ জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের বৈঠক ডেকেছেন। দেশটির সেনাবাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশ এখনও মাদুরো সরকারের অনুগত বলে মনে করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের ফলে রদ্রিগেজ এখন বৈধভাবে সামরিক বাহিনীকে আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা লাভ করলেন।
৫. গঞ্জালেস বনাম রদ্রিগেজ: ক্ষমতার টানাপোড়েন
এদিকে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল এবং যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত নেতা এডমুন্ডো গঞ্জালেসকে নিয়ে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিলেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য গঞ্জালেসকে ক্ষমতায় বসানো। তবে ভেনেজুয়েলার বিচার বিভাগ এবং বর্তমান শাসক গোষ্ঠী গঞ্জালেসকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে গণ্য করে। ফলে ডেলসি রদ্রিগেজ এবং গঞ্জালেসের সমর্থকদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
৬. এক অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে ভেনেজুয়েলা
মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের ‘শভিবাদ’ (Chavismo) রাজনীতির অবসান ঘটাতে চাইলেও ডেলসি রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করল। রাশিয়ার সমর্থন এবং অভ্যন্তরীণ সামরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে রদ্রিগেজ কতদিন এই ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়। লাতিন আমেরিকার আকাশে এখন যুদ্ধের ঘনঘটা এবং অনিশ্চয়তার কালো মেঘ।