সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন

হুতিরা ফোন করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই চায় না: ট্রাম্প

  • Update Time : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ Time View

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চায় না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, হুতিরা ফোন করে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেন কোনো পদক্ষেপ না নেয়, সেই অনুরোধ জানিয়েছে।

শনিবার আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘হুতিরা আমাদের ফোন করেছে। তারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না। তারা চায় না আমরা তাদের বিরুদ্ধে যাই।’

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এদিকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প। হামলাটি ইরান চালিয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, সম্ভবত তারাই।’

হামলার পর সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইনটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ।

ট্রাম্প জানান, এ বিষয়ে তিনি সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলেছেন। সৌদি যুবরাজকে নিজের ‘ভালো বন্ধু’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলার জন্য ইরান নয়, ইরাক থেকে ছোড়া কয়েকটি ড্রোন দায়ী। এসব হামলায় কয়েকজন আহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে রিয়াদ।

সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেবে না। ইরাক সরকারকে হামলার ঘটনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনগণকে সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

ইরাক সরকারও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তদন্তে হামলাটি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করার কথা জানিয়েছে।

ইরাকের দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সীমান্তের শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধ করে দিয়েছে ইরাক। পাশাপাশি হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়েছে।

এদিকে গত সপ্তাহজুড়ে টানা অভিযানের পর শুক্রবার ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের একটি বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেয় হুতিরা। এর আগে দ্রুত অভিযান চালিয়ে তারা তিনটি কৌশলগত দ্বীপও নিয়ন্ত্রণে নেয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে বাব আল-মান্দেব প্রণালি এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় পথ দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের পথের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে দেশটি।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির অবরোধের পর তেল পরিবহনের জন্য বিকল্প রুট ব্যবহারে জোর দিচ্ছে। তবে হুতিদের সাম্প্রতিক তৎপরতায় সেই পথও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিরা বেশির ভাগ জাহাজকে লোহিত সাগরে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে। তবে একটি দেশের জাহাজ নিয়ে তারা আপত্তি জানিয়েছে। বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে দুইবার ফোন করেন। ওই সময় তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলা চালানোর অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যেই চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুতিরা। অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী শনিবার হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত বন্দরনগরী মোখায় হামলা চালিয়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোখা বন্দরের কাছে হুতিদের কয়েকটি যান ও অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। সরকারি বাহিনীর দাবি, হামলায় কয়েকজন হুতিও নিহত হয়েছেন।

সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি জানান, মোখা-ধুবাব সড়কেও হুতিদের যান ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এলাকাটি মোখা শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে।

এর আগের দিন শুক্রবারও মোখায় গোলাবর্ষণের কথা জানিয়েছিল সরকারি বাহিনী। একই সঙ্গে তাইজ-মোখা ও মোখা-ধুবাব সড়ক ব্যবহার না করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়।

বৃহস্পতিবার মোখা দখলে নেয় হুতিরা। তাদের অভিযানের পর শহরটির বহু বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এডেনে চলে যান। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রধান ঘাঁটি এডেনেই।

শুক্রবার হুতি-সমর্থিত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি বাহিনী মোখা বিমানবন্দরে দুটি হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, শহরের সমুদ্রবন্দরে অজ্ঞাত উৎস থেকে ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।

গত সপ্তাহে শুরু হওয়া হুতিদের অভিযানে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে উভয় পক্ষের সূত্র জানিয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বর্তমান সংঘাতকে সেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধেরই নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার হুতিদের সামরিক বাহিনী জানায়, লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় তারা আরও অগ্রসর হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে ‘হামলার জবাব হামলা দিয়ে’ দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে তারা।

একই সঙ্গে হুতিরা জানিয়েছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য কোম্পানির জাহাজের জন্য সমুদ্রপথ নিরাপদ থাকবে।

তবে হুতিদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অনিশ্চিত হিসেবে দেখছেন। চলতি সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এতে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় তেহরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জুলাইয়ে অবরোধ ঘোষণার পর থেকেই লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে হুতিরা। সৌদি আরবের অভ্যন্তরে থাকা তেল স্থাপনাগুলোও তাদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে।

হুতিদের দাবি, ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অবরোধের জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, মোখা দখল ঠেকাতে সৌদি বিমানবাহিনী বড় ধরনের অভিযান না চালানোয় তারা বিস্মিত। তার দাবি, বড় আকারের বিমান অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি পায়নি সৌদি আরব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইয়েমেনের সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্র বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় ছিল না। হুতিরা সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে।

২০২৩ সালের শেষ দিকে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরুর পর থেকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওই সময় থেকেই বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালাতে শুরু করে হুতিরা।

চলতি বছর হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল পরিবহন বাড়িয়েছিল সৌদি আরব। তবে হুতিদের নতুন করে দেওয়া হুমকির কারণে ওই পথে সৌদি জাহাজ চলাচল আবারও কমেছে বলে জানিয়েছে লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স।

এখন সৌদি আরবকে তেল রপ্তানির জন্য আরও একটি বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে। লোহিত সাগরের উত্তর অংশ হয়ে ভূমধ্যসাগরে তেল পাঠানোর চেষ্টা করছে দেশটি। এ ক্ষেত্রে সুয়েজ খাল অথবা মিসরের একটি পাইপলাইন ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছাতে আগের তুলনায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।

তবে এই বিকল্প পথও পুরোপুরি হুমকিমুক্ত নয়। আগস্টের শেষ দিকে লোহিত সাগরের উত্তর অংশে একটি সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়েছিল হুতিরা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category