সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন

জোর করে পদত্যাগ করানো বৈধ নয়: হাইকোর্ট

  • Update Time : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ Time View

কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হলে তার আইনগত কোনো বৈধতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এমনভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা শিক্ষককে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

রায়ে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এ রায় দেন হাইকোর্ট। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইকবাল কবির।

রায় ঘোষণার সময় রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায় এবং বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি। বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন বা বিধিতেও জোরপূর্বক কিংবা চাপ প্রয়োগ করে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করা হয়নি।

মামলার পটভূমি

মামলার নথি থেকে জানা যায়, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার পরদিন এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন আলকাছ উদ্দিন আহমেদ। পরে ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান তিনি।

একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করে আইনি প্রতিকার ও প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের আবেদন করেন তিনি।

পরে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে তার পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তবে সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে একই বছর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পাশাপাশি জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে গত ২০ আগস্ট আগের জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন আদালত।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, প্রকৃতপক্ষে রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা ছিল না। এমনকি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি তার এমপিওভুক্ত বেতন-ভাতার অংশ পেয়ে আসছিলেন।

আদালত বলেন, এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ আইনগতভাবে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে এবং চাকরিতে বহাল রাখতে বাধ্য। ফলে তিনি অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের অধিকারী।

হাইকোর্ট আরও বলেন, আইন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে শিক্ষা বোর্ডের ক্ষমতা রয়েছে পরিচালনা পর্ষদ প্রস্তাবিত যেকোনো শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন কিংবা বাতিল করার। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও বোর্ডের রয়েছে।

সে অনুযায়ী শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রতি দেওয়া নির্দেশনা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। আদালতের মতে, ওই নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে পালন না করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচারের নীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং সমতার বিধানেরও পরিপন্থী।

আদালত বলেন, শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিবাদীরা সংবিধিবদ্ধ ও আইনগতভাবে বাধ্য। তাদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক অবহেলা এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

রায়ে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন, বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে রিট আবেদনকারীকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

আদালত আরও বলেন, এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নির্দেশনা অমান্যকারী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন।

এর মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, যিনি পরিচালনা পর্ষদের সদস্য-সচিব, তার এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও থাকতে পারে।

এসব পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার আলোকে রুলটি নিষ্পত্তি করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রুল জারির সময় দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল ও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের আদালতের আদেশ অবহিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category