ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মার্কিন কমান্ডো বাহিনী কর্তৃক নাটকীয়ভাবে তুলে নিয়ে আসার ঘটনায় যখন ওয়াশিংটনে উল্লাস চলছে, ঠিক তখনই খোদ নিউ ইয়র্ক শহর থেকে ভেসে এলো এক ভিন্ন সুর। নিউ ইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি এই সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘আন্তর্জাতিক আইনের নগ্ন লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন।
নতুন বছরের প্রথম দিন মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এটিই মামদানির প্রথম কোনো বড় ধরনের বৈদেশিক নীতি-সংক্রান্ত মন্তব্য, যা মার্কিন রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
১. মামদানির কড়া হুঁশিয়ারি: ‘আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত’
শনিবার মধ্যরাতে কারাকাসে ডেল্টা ফোর্সের অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সিএনএন নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জোহরান মামদানি তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রধানকে অন্য একটি দেশের সামরিক বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে তুলে নিয়ে আসা কোনোভাবেই সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না।
মেয়র মামদানি বলেন, নিকোলা মাদুরো এবং সিলিয়া ফ্লোরেসকে যেভাবে আটক করা হয়েছে, তা যুদ্ধের মতো এক নিকৃষ্ট কাজ। এটি কেবল ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতিরও পরিপন্থী।
২. কেন এই বিরোধিতা? মামদানির যুক্তি
মামদানি মনে করেন, যেকোনো দেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সেই দেশের জনগণের হাতে থাকা উচিত। বিদেশি হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তাঁর সমালোচনার প্রধান দিকগুলো হলো:
সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন: কোনো যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই একটি স্বাধীন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও স্থল অভিযান চালানো আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ।
গণতন্ত্রের পরিহাস: গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অজুহাতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতা পরিবর্তন করার যে দীর্ঘ ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, এটি তারই এক নতুন এবং বিপজ্জনক সংস্করণ।
মানবিক দিক: অভিযানের সময় বেসামরিক জানমালের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে মামদানি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
৩. ট্রাম্প বনাম মামদানি: নিউ ইয়র্ক কি নতুন রণক্ষেত্র?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে এই অভিযানকে ‘চমৎকার এবং সফল’ বলে দাবি করছেন, সেখানে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট মেয়র মামদানির এই অবস্থান কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে এক বড় ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মামদানি তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে নিউ ইয়র্কের প্রগতিশীল এবং লাতিন আমেরিকান ভোটারদের এক শক্তিশালী বার্তা দিলেন। উল্লেখ্য, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মামদানি অ্যাডামস আমলের ইসরায়েল-ঘনিষ্ঠ নীতিগুলো বাতিল করে নিজের স্বাধীন চেতনার পরিচয় দিয়েছেন। এখন ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে তিনি সরাসরি হোয়াইট হাউসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন।
৪. রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং জনমত
মামদানির এই মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রগতিশীল অধিকার কর্মীরা তাঁর সাহসকে স্বাগত জানালেও রিপাবলিকান নেতারা একে ‘জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী’বলে সমালোচনা করছেন।
নিউ ইয়র্কের স্থানীয় অনেক নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন মেয়রের কেন বৈদেশিক নীতি নিয়ে এতটা সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন? এর জবাবে মামদানির সমর্থকরা বলছেন, নিউ ইয়র্ক একটি বিশ্বজনীন শহর এবং এখানকার মেয়র হিসেবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলা তাঁর নৈতিক দায়িত্ব।
৫. ভেনেজুয়েলা সংকটে মামদানির পরবর্তী পদক্ষেপ
মামদানি কেবল নিন্দাই জানাননি, তিনি আহ্বান জানিয়েছেন যাতে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবিক আচরণ করা হয় এবং কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার যেন না হয়। তিনি নিউ ইয়র্কের অভিবাসী ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের শান্ত থাকার এবং সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
৬. এক নির্ভীক নেতৃত্বের উদয়
জোহরান মামদানির এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়েছে। যেখানে জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করাকে সমর্থন করা হবে না। ট্রাম্পের জমানায় মামদানির মতো একজন মেয়রের এই “বিদ্রোহী” সুর ভেনেজুয়েলা সংকটে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।