রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৫:০৬ অপরাহ্ন
Title :
ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণে সরকারকে ভূমিকা নিতে হবে: সংসদে পার্থ বিএনপি জুলাই সনদকে কলঙ্কিত করেছে: মামুনুল হক হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা, বাড়ছে উত্তেজনা ২০৩০ বিশ্বকাপে বাবার সঙ্গে খেলতে চান রোনালদোর ছেলে ফিফা যদি সত্যিই চায় আমরা বিদায় নিই, তাহলে সেটাই হোক: ইরানের ফুটবলার বাংলাদেশ ও চীন অর্থনৈতিক করিডোর বিবেচনায় রয়েছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্জেন্টিনাকে হারানো অসম্ভব নয়: কেপ ভার্দে কোচ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসও মনে রাখতে হবে: বিরোধী দলকে জয়নুল আবদিন এইচএসসি পরীক্ষার প্রতিটি কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর ফতোয়ার জন্য এখন আর মাদ্রাসায় যেতে হয় না, সংসদেই দেওয়া হয়: জামায়াতের এমপি

এক কিংবদন্তির বিদায় ও অশ্রুসিক্ত বাংলাদেশের হাহাকার

  • Update Time : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১২৮ Time View

এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক শোকাতুর মহাকাব্য। যে জীবনটি ছিল ত্যাগ, সংগ্রাম আর আপসহীনতার প্রতীক, আজ সেই জীবনের পার্থিব অধ্যায় সমাপ্ত হলো। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে বাংলাদেশ আজ অশ্রুসিক্ত।২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বাংলাদেশের আকাশে ঘনীভূত হলো এক বিষাদময় মেঘ। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবাস আর অসুস্থতার লড়াই শেষে সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ৮০ বছর বয়সে এই মহীয়সী নারীর প্রয়াণে থেমে গেল একটি রাজনৈতিক যুগের স্পন্দন। দেশ হারালো তার ‘আপসহীন’ অভিভাবককে, আর জাতি হারালো তার ঐক্যের প্রতীককে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাত থেকেই খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে।দেশে অবস্থানরত তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান খবর পেয়েই দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছান এবং জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে মায়ের শিয়রে বসে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন। ৩১ ডিসেম্বর সকালে বিএনপির ভেরিফায়েড পেজে দেখা যায় একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য মায়ের কফিনের পাশে বসে অশ্রুসিক্ত চোখে কোরআন পড়ছেন তারেক রহমান। এই দৃশ্য কেবল একটি দলের নেতার নয়, বরং একজন সন্তানের আর্তনাদ হিসেবে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যায়।

৩১ ডিসেম্বর বুধবার বেলা ২টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হয় ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী যেন থমকে যায়। উত্তরা থেকে মতিঝিল, মোহাম্মদপুর থেকে শাহবাগ সব পথ এসে মিশেছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। কালো ব্যাজ আর কালো পোশাকে আবৃত লাখ লাখ মানুষের পদভারে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজপথ।

খামারবাড়ি মোড়ে অজু করার পানির জন্য দীর্ঘ সারি, সংসদ ভবনের চারপাশে মানুষের ঢল আর কান্নার শব্দ মিলে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়। জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষ কেবল বিএনপির নেতা-কর্মী ছিলেন না, বরং সাধারণ রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পর্যন্ত সবাই এসেছিলেন তাদের প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে।

অন্তর্বর্তী সরকার বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং জানাজার দিন বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজে জানাজায় অংশ নেন এবং দেশনেত্রীর কফিনে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করেন।

বাংলাদেশের এই শোকের দিনে শামিল হতে বিশ্বনেতাদের ঢল নামে ঢাকায়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিশেষ বিমানে ঢাকা এসে তারেক রহমানের হাতে নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা পৌঁছে দেন। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা এবং ভুটান ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিরা জানাজায় শরিক হয়ে এই মহীয়সী নেত্রীর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব প্রমাণ করেন।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের জোয়ার বয়ে যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর ‘দূরদর্শী নেতৃত্ব’ এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁকে পাকিস্তানের ‘নিবেদিতপ্রাণ বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভারতের বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী শোকবার্তায় তাঁকে ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান মুখ’ হিসেবে শ্রদ্ধা জানান। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ পৃথক বিবৃতিতে বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাস গঠনে তাঁর অসামান্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করে।

তারেক রহমান তাঁর শোকবার্তায় লিখেছেন, আমার কাছে খালেদা জিয়া একজন মমতাময়ী মা, যিনি নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশ ও মানুষের জন্য। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসা এই নারী ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলের হাল ধরেন। দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে থেকে তিনি অর্জন করেন ‘আপসহীন নেত্রী’র খেতাব। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও নারী উন্নয়নে তাঁর যুগান্তকারী পদক্ষেপসমূহ আজও বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়।

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে দেশনেত্রীর মরদেহবাহী গাড়িটি শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানের দিকে যাত্রা শুরু করে। লাখ লাখ মানুষের ভিড় ঠেলে গাড়িটি যখন গন্তব্যে পৌঁছায়, তখন চারপাশ ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মুখরিত। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়, তোপধ্বনির মাধ্যমে তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হয়। অবশেষে তাঁরই স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ লড়াই শেষে স্বামী ও স্ত্রীর এই চিরস্থায়ী মিলন যেন এক মহাকাব্যিক সমাপ্তি।

দেশনেত্রীর মৃত্যুতে বিএনপি সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দলের প্রতিটি কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই ক্ষতি অপূরণীয়। জাতি কখনোই এটি কাটিয়ে উঠতে পারবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিন দিনের শোক পালিত হচ্ছে।

বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। তাঁর মৃত্যুতে একটি বিশাল যুগের অবসান ঘটল ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন ‘দেশমাতা’ হিসেবে।

মহাকালের যাত্রী আপনি, হে মহীয়সী নারী জাতি আপনাকে কোনোদিন ভুলবে না। আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি ও জান্নাতুল ফেরদাউস কামনা করি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category