দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে আয়োজিত নিরাপত্তা সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় নাটকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো সি তেওদোরো জুনিয়র। বক্তব্যের মাঝপথে চীনপক্ষের একটি চিরকুট হাতে পাওয়ার পর সেটি মঞ্চেই পড়ে শোনান তিনি। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের আচরণকে দাদাগিরি, ব্ল্যাকমেইল ও অসভ্যতা হিসেবে আখ্যা দিয়ে কড়া সমালোচনা করেন।
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিউল ডিফেন্স ডায়ালগের একটি অধিবেশনে এ ঘটনা ঘটে। তেওদোরো যখন পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, তখন সাদা কোট পরা এক ব্যক্তি মঞ্চে উঠে তার সামনে একটি কাগজ রেখে যান।
বক্তব্য থামিয়ে তেওদোরো বলেন, তার কাছে একটি চিরকুট এসেছে এবং সেটি চীন থেকে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। এরপর উপস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি জানতে চান, চিঠিটি সবার সামনে পড়ে শোনাবেন কি না। সম্মতি পাওয়ার পর তিনি চিরকুটের বক্তব্য পড়ে শোনান।
চিরকুটে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের অবস্থান তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে সালিশের বিষয়ে চীনের অবস্থান স্পষ্ট, ধারাবাহিক ও দৃঢ়। চীনের দাবি, ওই সালিশ আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে। ফিলিপাইনের পক্ষে দেওয়া রায়কে অবৈধ, বাতিল ও অকার্যকর বলেও উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি চীন ওই রায় গ্রহণ বা স্বীকৃতি দেয় না এবং এর বিরোধিতা করে বলে জানানো হয়।
চিরকুটের বক্তব্যের পর তেওদোরো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক কোনো মঞ্চে এমন একটি দেশের সঙ্গে কীভাবে আলোচনা করা সম্ভব, যে দেশ তাকে করা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সীমা ছাড়িয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজকদেরই অসম্মান করছে। তিনি প্রশ্ন করেন, এমন আচরণের পর কীভাবে শালীন ও সৌজন্যপূর্ণ সম্পর্ক আশা করা যায়।
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ ঘটনাকে মানসিক চাপ সৃষ্টি ও আগ্রাসনের কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, চীন আন্তর্জাতিক আইনকে মাটিতে ফেলে মাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে আয়োজক দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিদের প্রতিও যথাযথ সৌজন্য দেখানো হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চিঠিটি নিয়ে আসা ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে তেওদোরো ব্যঙ্গ করে বলেন, আন্তর্জাতিক একটি মঞ্চে চীন কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং তাদের অবস্থান কতটা দুর্বল, এই কাগজ তারই স্মারক হিসেবে তিনি সংরক্ষণ করবেন। চিঠিটি দেওয়ার জন্য ওই ব্যক্তিকে ধন্যবাদও জানান তিনি।
দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কর্মকাণ্ড নিয়েও বক্তব্য দেন তেওদোরো। তিনি বলেন, গণচীন সরকারের কাছ থেকে ফিলিপাইন প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। দেশটির দাবি, ফিলিপাইনের ভূখণ্ড, বিশেষ করে দেশটির একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীন অবৈধভাবে নিজেদের উপস্থিতি জাহির ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
তেওদোরোর ভাষ্য, আন্তর্জাতিক নিয়মবহির্ভূত চীনা কর্মকাণ্ডের কারণেই ফিলিপাইন মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে বাধ্য হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঘটনার ভিডিও ফিলিপাইনের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের আনুষ্ঠানিক এক্স অ্যাকাউন্টেও প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, সিউলে অনুষ্ঠিত সিউল ডিফেন্স ডায়ালগ ২০২৬-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় চীনপক্ষের পাঠানো চিরকুটের জবাব দিচ্ছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো সি তেওদোরো জুনিয়র।
দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে ম্যানিলা ও বেইজিংয়ের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল। এতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।