পলোগ্রাউন্ডের আকাশে তখন বিকেলের রোদ্রছায়া। কিন্তু মাঠের উত্তাপ যেন মরুভূমির লু-হাওয়াকেও হার মানায়। হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠ চিরে যখন স্লোগান উঠছিল, ঠিক তখনই মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘অনরা ক্যান আছেন?'(আপনারা কেমন আছেন?)। মুহূর্তেই পাহাড়-সমুদ্র ঘেরা এই বাণিজ্যিক রাজধানীর জনসমুদ্র যেন জলোচ্ছ্বাসের মতো গর্জে উঠল, ‘ভালা আছি!।
রোববার দুপুরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই একটি মাত্র বাক্য দিয়েই শুরু হলো চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জনসভা। কেবল একটি কুশল বিনিময় নয়, এটি ছিল চট্টগ্রামের মানুষের সাথে তার হারানো আত্মিক বন্ধন পুনঃস্থাপনের এক অনন্য মুহূর্ত।
বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি স্মরণ করেন এই মাটির সাথে তার পরিবারের নাড়ির সম্পর্কের কথা। তিনি বলেন, ‘এই সেই চট্টগ্রাম—এই সেই পুণ্যভূমি, যেখান থেকে আমার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আবার এই সেই মাটি, যেখানে তিনি দেশের জন্য নিজের রক্ত বিলিয়ে দিয়ে শহীদ হয়েছিলেন।
তারেক রহমান আরও যোগ করেন, ‘এই চট্টগ্রামই আমার মা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘দেশের নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। সুতরাং চট্টগ্রামের উন্নয়ন এবং সম্মান রক্ষা করা আমার জন্য কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি আমার পারিবারিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা।’
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মানচিত্রে আজকের দিনটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ, সর্বশেষ ২০০৫ সালের ৬ মে লালদীঘি ময়দানে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে জনসভা করেছিলেন তারেক রহমান। মাঝখানের দীর্ঘ ২০ বছরে গড়িয়েছে অনেক জল। প্রতিকূল রাজনীতি, নির্বাসন এবং চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার তিনি এলেন দলের ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে।
পলোগ্রাউন্ডের ইতিহাসে এটিই তার প্রথম জনসভা। এর আগে ২০১২ সালে তার মা বেগম খালেদা জিয়া এই মাঠে যে জনসমুদ্র তৈরি করেছিলেন, আজকের জনসভা যেন সেই স্মৃতিকেই আরও প্রখর করে তুলল। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই উপস্থিতি চট্টগ্রামের ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের মধ্যে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমানের এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিএনপির লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এবং একটি সত্যিকারের জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই বিএনপির মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ যে ভোটাধিকার বঞ্চিত ছিল, তা ফিরিয়ে দিতে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি দলের প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীকে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং শান্তিপূর্ণভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন।
ভোর হতে না হতেই চট্টগ্রামের সড়কগুলো পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। উত্তর থেকে দক্ষিণ, শহর থেকে গ্রাম সব পথ যেন মিশে গিয়েছিল পলোগ্রাউন্ডে। ব্যানার, ফেস্টুন আর ধানের শীষের প্রতিকৃতিতে ছেয়ে গিয়েছিল টাইগার পাস থেকে শুরু করে আমবাগান এলাকা। দলীয় নেতাকর্মীদের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা।
চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতিতে যারা প্রভাবশালী নেতা, তাদের জন্য এটি ছিল নিজেদের শক্তির মহড়া দেওয়ার এক বড় সুযোগ। প্রতিটি মিছিলের অগ্রভাগে থাকা তরুণদের উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো, যা মূলত ‘জুলাই বিপ্লব’ পরবর্তী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের ‘চাটগাঁইয়া’ ভাষায় কথা বলাটি ছিল একটি সুচিন্তিত ও আবেগপ্রসূত রাজনৈতিক কৌশল। চট্টগ্রামের মানুষ নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর নিজ দেশের মাটিতে ফিরে এসে স্থানীয় ভাষায় কুশল বিনিময় করার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি মাটির কাছাকাছি থাকা একজন নেতা। এটি সাধারণ মানুষের মনে তার প্রতি এক ধরনের গভীর মমত্ববোধ তৈরি করেছে।
পলোগ্রাউন্ডের এই জনসভা কেবল একটি নির্বাচনী জনসভা ছিল না; এটি ছিল বিএনপির জন্য ঘর গোছানোর এবং জনগণের সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। তারেক রহমানের বক্তব্যে ছিল একদিকে যেমন সংগ্রামের ডাক, অন্যদিকে ছিল আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি।
বক্তব্য শেষে তিনি যখন মাঠ ত্যাগ করছিলেন, তখনও হাজার হাজার মানুষের ‘তারেক রহমান’ স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছিল চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো। এই জনসভা কি আগামী নির্বাচনে চট্টগ্রামের সবকটি আসনে বিএনপির জন্য জয়ের পথ সুগম করবে? সেই উত্তর হয়তো সময়েই দেবে, তবে আজ চট্টগ্রাম বুঝিয়ে দিয়েছে—রাজনীতির মাঠ এখনও তার পুরনো সেনাপতিদের অপেক্ষায় উন্মুখ।