চব্বিশের জুলাই আগস্টের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের জন্য এক ঐতিহাসিক আইনি ঢাল তৈরি করল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অভ্যুত্থান চলাকালীন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, এমন নিশ্চয়তা দিয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ’ অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
আইনি সুরক্ষার পরিধি ও মামলা প্রত্যাহার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে গত কয়েক মাসে যেসব ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। আজকের এই অধ্যাদেশ অনুমোদনের মাধ্যমে সেই উদ্বেগের অবসান ঘটল।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে যদি কোনো ফৌজদারি মামলা থেকে থাকে, তবে সরকার সেগুলো দ্রুত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই অধ্যাদেশের ফলে ভবিষ্যতে ওই সময়ের কোনো ঘটনার জন্য নতুন করে আর কোনো মামলা করা যাবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আইনি সুরক্ষা বিপ্লবের সংহতি ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধ করতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
গণভোট ও সংস্কার: জনগণের ওপরই চূড়ান্ত ভার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর অন্যতম হলো গণভোট। এই ইস্যুতে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে আসিফ নজরুল বলেন, আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, বরং গণঅভ্যুত্থানের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা, অর্থাৎ সংস্কারের পক্ষে দাঁড়িয়েছি।
গণভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি আরও বলেন, জনগণ সংস্কারের পক্ষে থাকলে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন। যদি কেউ মনে করেন যে তারা ফ্যাসিস্ট আমলের মতো শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চান, তবে তারা নির্দ্বিধায় ‘না’ ভোট দিতে পারবেন। সরকার কোনো পক্ষ নেবে না, এটি সম্পূর্ণ জনগণের ওপর নির্ভর করছে। উপদেষ্টা যোগ করেন যে, আগের জমানার মতো ভোট কারচুপি নয়, বরং এবার ভোটাররা স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবেন।
ক্রিকেট রাজনীতি ও শ্রীলঙ্কা ভেন্যু প্রসঙ্গ সংবাদ ব্রিফিংয়ে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার বিষয়ে সরকারের আগের অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করা হয়।
আইন উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশ দলের ম্যাচগুলোর ভেন্যু যদি শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরিত হয়, তবেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নেবে। এর বাইরে অন্য কোনো শর্তে আপস করবে না সরকার। এই অনড় অবস্থান মূলত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা এবং নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রধান্য দেওয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অধ্যাদেশের গুরুত্ব ও আগামীর রাজনীতি এই সুরক্ষা অধ্যাদেশ মূলত একটি রাজনৈতিক এবং আইনি নিশ্চয়তা। যারা জীবন বাজি রেখে রাজপথে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছেন, তারা যেন আইনি মারপ্যাঁচে হয়রানির শিকার না হন, সেটিই এই আইনের মূল লক্ষ্য। একই সাথে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি বর্তমান সরকারের গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দেয়।
এক নজরে আজকের ব্রিফিংয়ের মূল পয়েন্টগুলো বিপ্লবীদের সুরক্ষা, নতুন কোনো মামলা করা যাবে না, আগের মামলা প্রত্যাহার হবে। গণভোট, সংস্কার প্রশ্নে জনগণের সরাসরি রায় নেওয়া হবে। সংস্কারের পক্ষ, সরকার কোনো দলের নয়, বরং সংস্কারের পক্ষে কাজ করছে। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ভেন্যু শ্রীলঙ্কা হলে তবেই অংশগ্রহণ করবে বাংলাদেশ।
আজকের এই অধ্যাদেশ অনুমোদন জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পথে এক বিশাল পদক্ষেপ। আইন উপদেষ্টার বক্তব্যে এটি পরিষ্কার যে, অন্তর্বর্তী সরকার আইনি এবং প্রশাসনিকভাবে সংস্কারের পথ সুগম করতে বদ্ধপরিকর।