সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

সাবেক প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমানের জানাজায় অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী

  • Update Time : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬
  • ৮ Time View

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও দেশের খ্যাতনামা শিল্পোদ্যোক্তা, সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহার প্রথম জানাজার নামাজে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি অংশগ্রহণ করেন এবং মরহুমের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর প্রতি গভীর ও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

রোববার সকাল সাড়ে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নিহতের দাফন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এই তথ্য নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মরহুম মিজানুর রহমান সিনহার জানাজার নামাজ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

আজকের এই শোকাবহ জানাজা নামাজে ইমামতি করেন জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র পেশ ইমাম আলহাজ্ব হযরত মাওলানা আবু রায়হান। জানাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম), ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এছাড়াও অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী মহলের প্রতিনিধি এবং সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মরহুমের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অসংখ্য গুণগ্রাহী অংশ নেন।

জানাজার নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মরহুমের কফিনের পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাঁর রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর একে একে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম), স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অন্যান্য মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পরম করুণাময়ের দরবারে মরহুমের রুহের মাগফিরাত ও চিরস্থায়ী শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে প্রধানমন্ত্রীসহ উপস্থিত সকলে অশ্রুসিক্ত চোখে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

উল্লেখ্য, সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা গত শুক্রবার রাতে সিঙ্গাপুরের একটি উন্নত সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

দেশে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি পরপারে পাড়ি জমান। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দেশে পৌঁছালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং তাঁর নির্বাচনী এলাকা মুন্সীগঞ্জে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।

মিজানুর রহমান সিনহা বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিল্প খাতে এক অত্যন্ত পরিচিত ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ১৯৪৩ সালে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার প্রত্যয় নিয়ে ব্যবসায়িক পরিমন্ডলে প্রবেশ করেন এবং কঠোর পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি মিজানুর রহমান সিনহা আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। তৃণমূলের মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলার কারণে তিনি অত্যন্ত অল্প সময়ে মুন্সীগঞ্জের সাধারণ মানুষের নয়নমণিতে পরিণত হন।

৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯৬) ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টংগিবাড়ী) আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চূড়ান্ত মনোনয়ন লাভ করেন। ওই নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। বিরোধী দলে থাকাকালীনও তিনি সংসদে এবং সংসদের বাইরে এলাকার মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিলেন।

৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১) ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিজানুর রহমান সিনহা পুনরায় একই আসন (মুন্সীগঞ্জ-২) থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিশাল ব্যবধানে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মিজানুর রহমান সিনহার যোগ্যতা, সততা ও সাংগঠনিক দক্ষতার প্রতি আস্থা রেখে তাঁকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ‘সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী’ হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে মিজানুর রহমান সিনহা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে দেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশ এবং ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধে তাঁর নেওয়া কিছু নীতিগত পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলাসহ সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চিকিৎসকের শূন্যপদ পূরণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

মিজানুর রহমান সিনহা কেবল একজন সফল মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যই ছিলেন না, বরং বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সুদীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে অত্যন্ত সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। দলের কঠিন সময়ে ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে তাঁর দূরদর্শী পরামর্শ দলকে সঠিক পথ দেখাতে সাহায্য করেছিল।

রাজনৈতিক জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাননি। বিএনপির সর্বশেষ ঘোষিত ও পুনর্গঠিত মুন্সীগঞ্জ জেলা কমিটিতে তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আহ্বায়ক’ (Convener) পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে মিজানুর রহমান সিনহা দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক খাতের এক অবিসংবাদিত নায়ক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড’ এবং একমি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

তাঁর হাত ধরেই একমি ল্যাবরেটরিজ ক্ষুদ্র পরিসর থেকে আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং বিশ্বমানের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশে একমির ওষুধ রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তাঁর এই শিল্পোদ্যোগ দেশের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশের জিডিপিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ব্যবসায়ী মহলে তিনি একজন দূরদর্শী, নীতিবান এবং মানবিক ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে সমাদৃত ছিলেন।

মিজানুর রহমান সিনহার এই আকস্মিক প্রয়াণে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। জানাজা শেষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, মিজানুর রহমান সিনহা ছিলেন একজন সজ্জন, দেশপ্রেমিক ও দক্ষ রাজনীতিবিদ। দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং একই সাথে দেশের শিল্পায়নে তাঁর অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় এবং এলাকার জনগণের কল্যাণে মিজানুর রহমান সিনহা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আমরা একজন অত্যন্ত সজ্জন সাবেক সহকর্মীকে হারালাম।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ ভবনে প্রথম জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর মরহুমের মরদেহ তাঁর প্রিয় জন্মভূমি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও টংগিবাড়ী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কিছুক্ষণ রাখা হবে এবং দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হবে। তাঁর এই অবর্তমানে মুন্সীগঞ্জ তথা সমগ্র দেশ একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক, সফল উদ্যোক্তা এবং জনদরদী নেতাকে হারাল।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category