ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পায়রা চত্বর সোমবার সকাল থেকেই কার্যত এক তাৎক্ষণিক জনমঞ্চে রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার সরাসরি সম্প্রচার দেখতে সেখানে জড়ো হন হাজারো মানুষ। তাদের বড় অংশই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ প্রত্যাশা করেন।
রায় ঘোষণার অপেক্ষায় থাকা জনতার একাধিক ব্যক্তি জানান, জুলাইয়ের সহিংসতায় যেভাবে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে-তার ন্যূনতম বিচার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য শাস্তি যথেষ্ট নয়। অনেকেই বলেন, ‘ফাঁসিই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে না-তার চেয়েও জরুরি দ্রুত রায় কার্যকরের ব্যবস্থা নেওয়া।
রায়কে ঘিরে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে নিরাপত্তা বহুলাংশে বাড়ানো হয়েছে। শাহবাগ-হাইকোর্ট-টিএসসি-মতিঝিলসহ কয়েকটি এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা এবং বিশেষায়িত বাহিনী মোতায়েন করা হয়। যেকোনো সম্ভাব্য উত্তেজনা মোকাবিলায় টহলও জোরদার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আবহ উত্তপ্ত থাকায় নিরাপত্তা পরিকল্পনা ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ নীতিতে সাজানো হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, নিপীড়ন ও হামলার ঘটনাগুলো তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় নেয়।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলাটি ছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই দায়ের করা বিবিধ মামলা। তদন্ত ও শুনানির বিভিন্ন পর্যায় শেষে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
পরবর্তীতে, ২০২৫ সালের মার্চে মামলার পরিধি বাড়িয়ে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে নতুন আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়।
এরপর মামলার পাঁচটি অভিযোগ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ব্যাপক আকারের সেই প্রতিবেদন ছিল প্রায় ৮ হাজার ৭০০ পৃষ্ঠার-যেখানে তথ্যসূত্র, জব্দ তালিকা, সাক্ষ্য, শহীদদের বিবরণসহ বিশদ উপাদান উপস্থাপন করা হয়। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন শেষে বিচার শুরু হয়।
মামলার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল তখনকার আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুনের ‘রাজসাক্ষী’হয়ে উঠা। দোষ স্বীকার করে ঘটনাবলি ব্যাখ্যা করার আবেদন আদালত মঞ্জুর করলে তিনি মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য প্রদান করেন। প্রসিকিউশন দাবি করে, তার সাক্ষ্যই ঘটনার কার্যক্রম, নির্দেশনাপদ্ধতি ও হত্যাযজ্ঞের কাঠামো সম্পর্কে চিত্র স্পষ্ট করে দেয়।
২৩ অক্টোবর যুক্তিতর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ দাবি করেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের সিদ্ধান্তকে জোরালো করে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামও মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন উভয় আসামির খালাস চান। যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল ১৩ নভেম্বর রায় ঘোষণা করার তারিখ জানিয়ে দেয়।
মামলার অভিযোগগুলোর সারসংক্ষেপ হলো, ১৪ জুলাইয়ের বক্তৃতা ও পরবর্তী গণহত্যা
শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের উসকানিমূলক মন্তব্যের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী কর্মীদের হাতে সহিংস হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়, যেখানে নিহত হয় প্রায় দেড় হাজার, আহত হয় ২৫ হাজার।
মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও উন্নত অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইজিপিকে অভিযুক্ত করা হয়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ হত্যা, সরাসরি গুলি করে হত্যার ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে নেতৃত্বদানের অভিযোগ আনা হয়।
চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা, নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দায়ের অভিযোগ।
আশুলিয়ায় ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, পরিকল্পিতভাবে নিপীড়ন ও হত্যা সংঘটনের অভিযোগ।
রায়ের আগ মুহূর্তে পায়রা চত্বরে আসা অনেকেই বলেন, এত মানুষের রক্তের দামে যে বিচার শুরু হলো, তা অর্ধেক পথে থেমে থাকা উচিত নয়।
একজন যুবক বলেন, দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর না করলে ন্যায়ের পূর্ণতা আসবে না।
আরেকজন বলেন, এটা রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, এটা গণহত্যার বিচার-রাষ্ট্রের মর্যাদা এখানেই।
রায় ঘোষণার সময় যতই ঘনিয়ে আসে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত পুরো অংশজুড়ে অদৃশ্য চাপ বাড়তে থাকে। মানুষ দেখছে রায় কেমন আসে; রাষ্ট্র দেখছে কীভাবে প্রতিক্রিয়া সামলাবে।
আজকের রায়-অনেকের মতে-বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হবে।