বর্তমান আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের ব্যাপক প্রসারের ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রম যেমন দ্রুত ও সহজ হয়েছে, ঠিক তেমনই অপরাধের ধরন ও মাত্রাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। চিরাচরিত অপরাধের একটি বড় অংশ এখন স্থানান্তরিত হয়েছে ভার্চুয়াল জগতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার চালানো, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অনলাইন অর্থসংক্রান্ত প্রতারণা, হ্যাকিং, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার, ডার্ক ওয়েবে রাষ্ট্রবিরোধী ও উগ্রবাদী প্রচারণা এবং সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের মতো জটিল সাইবার অপরাধ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের সার্বিক সাইবার স্পেসকে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও অপরাধমুক্ত রাখতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর অধীনে যাত্রা শুরু করল অত্যন্ত আধুনিক, দক্ষ ও বিশেষায়িত ‘সাইবার পুলিশ সেন্টার, চট্টগ্রাম’।
বুধবার (১৪ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্স, দামপাড়ায় আয়োজিত এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই নতুন সেন্টারের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সিআইডি তথা বাংলাদেশ পুলিশের ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা এক ঐতিহাসিক নতুন মাইলফলকে পদার্পণ করল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিস্তারিত ও সম্মানিত অতিথিবৃন্দ
“Safer Cyberspace for Digital Bangladesh, Enhancing National & Regional Digital Investigation Capability of Bangladesh Police” শীর্ষক বিশেষ প্রকল্পের আওতায় এবং কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (KOICA) আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় এই আন্তর্জাতিক মানের সেন্টারটি গড়ে তোলা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সাইবার পুলিশ সেন্টারের ফলক উন্মোচন ও শুভ উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, এমপি।
সিআইডি প্রধান, অ্যাডিশনাল আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের মহামান্য রাষ্ট্রদূত এইচ.ই. মি. কিম জি-জুন এবং চট্টগ্রাম-১০ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, এমপি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিপিএম এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অ্যাডিশনাল আইজিপি সরদার নুরুল আমিন, বিপিএম।
এছাড়াও কোইকা (KOICA) ও কোরিয়ান দূতাবাসের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন KOICA-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম, কোরিয়ান দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন কিম হে-জুং, KOICA বাংলাদেশ অফিসের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর সুজিন কং এবং PMC-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার প্রফেসর গিবুম কিম।
অবকাঠামো, বাজেট ও কারিগরি সক্ষমতা
১৮ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদিত এই মেগা প্রকল্পটি মোট ৫৯ কোটি ৮ লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রধান যেসব ভৌত ও কারিগরি উন্নয়ন সম্পন্ন করা হয়েছে:
সাইবার পুলিশ সেন্টারের মূল লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
চট্টগ্রামে সিআইডির অধীনস্থ এই বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় চট্টগ্রামসহ দেশের সমগ্র দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সাইবার অপরাধ দমন এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে:
১. দ্রুততম সময়ে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ: অনলাইন অপরাধ বা সাইবার হামলার শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের জন্য দ্রুততম সময়ে ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ (Digital Evidence) এক্সট্র্যাক্ট করা এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে তা নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা সহজ হবে, যা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় শক্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
২. সাইবার থ্রেট মনিটরিং ও অনলাইন উগ্রবাদ দমন: ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর ২৪/৭ গোয়েন্দা নজরদারি রাখা সম্ভব হবে। এর ফলে উগ্রবাদী প্রচারণা ও স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের মতো জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত হুমকি শুরুতেই নস্যাৎ করা সম্ভব হবে।
৩. জটিল আর্থিক অপরাধ ও হুন্ডি প্রতিরোধ: ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার এবং আধুনিক অনলাইন অর্থ প্রতারণার নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে গোয়েন্দা তৎপরতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
৪. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: KOICA-এর সহযোগিতায় প্রযুক্তি ও দক্ষতার সুষম আদান-প্রদানের ফলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ নেটওয়ার্ক ট্র্যাকিংয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে।
চট্টগ্রামে সিআইডির এই নতুন সাইবার পুলিশ সেন্টারটি স্থাপনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাধারণ নাগরিকেরা এখন থেকে সাইবার হয়রানি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর প্রযুক্তিনির্ভর সেবা পাবেন। এটি শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং ডিজিটাল স্পেসে অপরাধ দমন করে জনগণের নিরাপত্তা ও পুলিশের প্রতি জনআস্থা আরও সুদৃঢ় করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে।