ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সংকট সমাধানের দাবিতে চলমান ছাত্র আন্দোলন মঙ্গলবার বড় আকারের বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। গত এক সপ্তাহের আন্দোলনে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার এবং অন্তত ১৯০ শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর দেশজুড়ে সর্বাত্মক প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলো।
ছাত্র সংগঠনগুলোর আহ্বানে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করছেন। দেশটির অন্যতম বৃহৎ বামপন্থি ছাত্র সংগঠন লুনিয়ঁ এতুদিয়ঁতের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ফ্রান্সের ৩০টিরও বেশি স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মার্সেই, নিস, নান্তেস, লিওঁ ও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। এসব শহরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পদযাত্রায় অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবারের কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক ফ্রান্সের হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের প্রধান সংগঠন উঁনিয়ঁ সাঁদিকাল লিসিয়েনের (ইউএসএল) দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বর্তমানে ১ হাজার ৮০০ স্কুল অবরুদ্ধ অথবা বন্ধ করে রেখেছে। একই সঙ্গে ৯০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ ‘এক নতুন উচ্চতায়’ পৌঁছেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহের বিক্ষোভে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ১৯০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ছাত্র সংগঠনগুলো সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেয়।
সংঘর্ষের সময় উত্তরের শহর লেন্সে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া গত সপ্তাহে সেন্ট-উঁয়া-লোমোনে টিয়ার গ্যাসের শেলের আঘাতে ১৪ বছর বয়সী ইডেন গুরুতর আহত হয়। তার উভয় চোয়াল ভেঙে যাওয়ায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইডেনের মা বলেন, “এটি লজ্জাজনক, অপমানে ভরা, নৃশংস ও ভয়াবহ। পড়ালেখার ভালো পরিবেশ দাবি করা শিশুদের ওপর এভাবে চড়াও হওয়া উচিত নয়।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন ল্যকরনু শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়গুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
তবে সহিংসতার বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সহিংসতার বিষয়ে আমরা কোনো আপস করব না। আমরা আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের পাশে আছি।”
প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউএসএল অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, সরকার বাস্তবসম্মত কোনো স্পষ্ট সমাধান দেয়নি।
সরকারের অবহেলা এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের ‘নজিরবিহীন দমন-পীড়নের’ প্রতিবাদে মঙ্গলবার দেশজুড়ে সর্বাত্মক কর্মসূচির আহ্বান জানায় ইউএসএল। তাদের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ফ্রান্সের প্রধান শিক্ষক সমিতি এসএনইএস-এফএসইউ তাদের সদস্যদেরও মঙ্গলবার রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছে।
ফ্রান্সের কট্টর বামপন্থি দল লা ফ্রঁস আঁসুমিজের নেতা জ্যাঁ-লুক মেলাঁশোঁ এই বিক্ষোভকে ১৯৬৮ সালের ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর দেশটির ‘সবচেয়ে শক্তিশালী স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
গত সেপ্টেম্বরে প্যারিসে প্রথম এই বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রেণিকক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ ভবন ও শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে প্রথমে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলেও পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।
উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা শত শত স্কুল অবরুদ্ধ করে রাখে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর এ পর্যন্ত অন্তত ২৪টি স্কুলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
ছাত্র সংগঠনগুলো পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুললেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়াস দাবি করেছেন, পুলিশ অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে।
আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। কট্টর ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন বলেন, “এটি এখন আর শিক্ষার্থীদের সাধারণ আন্দোলন নেই, এটি পেশাদারদের দাঙ্গা, যা লা ফ্রঁস আঁসুমিজের আইনপ্রণেতারা উসকে দিচ্ছেন।”
অন্যদিকে, মার্সেইয়ের মেয়র বেনোয়া পায়াঁ সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আর বামপন্থি নেতা মেলাঁশোঁ আন্দোলনরত তরুণদের সুরক্ষায় দেশবাসীকে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।