ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরি থেকে ছড়িয়ে পড়া ছাইয়ের কারণে দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০৯টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। এতে ২২ হাজারের বেশি যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে জাকার্তার কাছে সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের আকাশে আগ্নেয় ছাই শনাক্ত হওয়ার পর ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। পরে স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১টা পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ কার্যকর রাখার কথা জানানো হয়।
ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিতের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চলাচলকারী উড়োজাহাজে। পাশাপাশি দোহা, সিডনি ও কুয়ালালামপুরের মতো আন্তর্জাতিক রুটেও বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী সুন্দা প্রণালিতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরি শুক্রবার গভীর রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর সেখানে একাধিক ভূকম্পন, লাভা নির্গমন এবং বিকট শব্দের ঘটনা ঘটে। রোববার ভোরেও আগ্নেয়গিরিটি থেকে আরও দুটি অগ্ন্যুৎপাতের খবর পাওয়া যায়।
তবে সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি বলে জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ। আগ্নেয় ছাই ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। আগ্নেয় ছাই শ্বাসতন্ত্রের পাশাপাশি চোখ ও ত্বকে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কমপাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছাইয়ের কারণে চোখে জ্বালাপোড়াসহ বিভিন্ন ধরনের অস্বস্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে শনিবার কয়েকটি স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। সমুদ্রেও আগ্নেয় ছাইয়ের প্রভাব পড়ায় কয়েকজন জেলে মাছ ধরতে যেতে পারেননি।
স্থানীয় বাসিন্দা আলদি চান্দ্রা প্রাযোগি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই তার চোখে এমন অনুভূতি হচ্ছিল, যেন বালুর কণা ঢুকে আছে। অস্বস্তি কমাতে তাকে চোখের ড্রপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। তার ভাষ্য, বাড়ির উঠানে এত বেশি ধুলা জমছে যে কয়েক মিনিট পরপর পরিষ্কার করতে হচ্ছে।
আনাক ক্রাকাতাউয়ের ভয়াবহ অতীত
আনাক ক্রাকাতাউ শব্দের অর্থ ‘ক্রাকাতাউয়ের সন্তান’। ১৮৮৩ সালের ভয়াবহ ক্রাকাতাউ অগ্ন্যুৎপাতের পর সমুদ্রের মধ্যে তৈরি হওয়া বিশাল আগ্নেয়গিরির গর্তের ভেতর থেকেই পরবর্তীতে এই আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়। গত শতকের শুরু থেকে এটি বিভিন্ন সময়ে সক্রিয় হয়ে আসছে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আনাক ক্রাকাতাউয়ের একটি বড় অংশ ধসে সাগরে পড়ে। এর ফলে সৃষ্ট শক্তিশালী সুনামিতে ৪০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। জাভা ও সুমাত্রার উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বহু মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হন।
বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, ওই ধসের সময় আগ্নেয়গিরি থেকে সাগরে নেমে যাওয়া কয়েকটি শিলাখণ্ডের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭০ থেকে ৯০ মিটার।
ভূমিকম্প-অগ্ন্যুৎপাতপ্রবণ ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। এ কারণে দেশটিতে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটে। প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে থাকা এই ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে বিভিন্ন সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত দেখা যায়।
আনাক ক্রাকাতাউয়ের এবারের অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাবে শুধু বিমান চলাচল নয়, আশপাশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।