দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে এক বড় ধরণের চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ। গাজার পুনর্গঠন এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে গঠিত এই পর্ষদ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে এই পর্ষদে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প যে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নজিরবিহীন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই শান্তি পর্ষদে স্থায়ী সদস্যপদ পেতে হলে প্রতিটি দেশকে গুনতে হবে ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংগৃহীত এই বিশাল অর্থ খরচ করা হবে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন কাজে। যদিও তিন বছরের জন্য অস্থায়ী সদস্য যারা হবেন, তাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো আর্থিক বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। তবে ‘স্থায়ী সদস্য’ হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের এই সুযোগকে অনেকেই ট্রাম্পের ‘করপোরেট কূটনীতি’ হিসেবে দেখছেন।
ইতিমধ্যেই বিশ্বের কমপক্ষে ২০টি দেশ এই পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে।
হাঙ্গেরি ও ভিয়েতনাম: ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার সিজার্তো জানিয়েছেন, অরবান মনে করেন এই পর্ষদই বিশ্ব শান্তির একমাত্র কার্যকর পথ। অন্যদিকে, ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান তো লামও এই প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।
ভারত ও অস্ট্রেলিয়া: ভারত ইতিমধ্যেই আমন্ত্রণ পেয়েছে এবং উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি আরও বিশদভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।
অন্যান্য দেশ: জর্ডান, পাকিস্তান, গ্রিস, সাইপ্রাস, কানাডা, তুরস্ক, মিসর, আর্জেন্টিনা এবং আলবেনিয়ার মতো দেশগুলোও আমন্ত্রণপত্রের তালিকায় রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে চলমান ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকেই চূড়ান্ত সদস্য তালিকা ঘোষণা করা হতে পারে।
গত ১০ অক্টোবর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতি এখন দ্বিতীয় ধাপে পা রেখেছে। এই শান্তি পর্ষদের মূল কাজ হবে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করা। ট্রাম্পের ২০ দফার এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে:
১. একটি নতুন ফিলিস্তিনি অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন।
২. একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন।
৩. হামাসকে সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত্রীকরণ।
৪. আন্তর্জাতিক অর্থায়নে গাজার অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘বোর্ড অব পিস’ সরাসরি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদ যেখানে গাজা ইস্যুতে বারবার ভেটোর মুখে অচল হয়ে পড়েছে, সেখানে ট্রাম্প তার নিজস্ব এই পর্ষদের মাধ্যমে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চান। তাছাড়া, ট্রাম্প প্রশাসন ও অন্যান্য দাতা দেশগুলোর অর্থায়ন কমে যাওয়ায় জাতিসংঘের প্রভাব বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমুখী।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েল এই পর্ষদের ‘নির্বাহী কমিটি’ গঠন নিয়ে প্রকাশ্য আপত্তি জানিয়েছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সাথে কোনো সমন্বয় ছাড়াই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা তাদের জাতীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে এক ধরণের কূটনৈতিক টানাপোড়েন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শান্তি পর্ষদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে যে নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে রাজনীতিকদের চেয়ে ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের প্রাধান্য বেশি। এই কমিটিতে আছেন:
জ্যারেড কুশনার: ট্রাম্পের জামাতা এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মূল কারিগর।
রুবিও: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
টনি ব্লেয়ার: যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
অজয় বাঙ্গা: বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট।
ইয়াকির গ্যাবে: ইসরায়েলি ধনকুবের।
এছাড়া কাতার, মিসর ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে যাতে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে তাদের প্রভাব ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে তুরস্কের সাথে হামাসের সুসম্পর্ক থাকায় তাদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘বোর্ড অব পিস’ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যেমন গাজা পুনর্গঠনের জন্য অর্থের জোগান নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে ‘স্থায়ী সদস্যপদে ১০০ কোটি ডলারের শর্ত’ প্রশ্ন তুলছে যে—শান্তি কি তবে এখন কেনাবেচার বিষয়?
দাভোসের ঘোষণা থেকে স্পষ্ট হবে, কতটি দেশ এই বিশাল অঙ্কের অর্থ দিয়ে ট্রাম্পের এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় শরিক হয়। যদি এটি সফল হয়, তবে হয়তো আগামী দিনে নিরাপত্তা পরিষদের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠবে ট্রাম্পের এই ‘বোর্ড অব পিস’।