আসন্ন নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর কঠোর নীতির অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে সেনাবাহিনী। গ্রেপ্তারকৃতরা এলাকায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি ও বিক্রির চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে নিশ্চিত করেছে আভিযানিক দল।
শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাতে বোয়ালখালীর বেংগুরা এলাকায় এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালানো হয়। অভিযানে শুধু অস্ত্রই নয়, অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে, যা ওই এলাকায় একটি ছোট অস্ত্র কারখানার অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়।
পুকুরে ঝাঁপ দিয়েও মেলেনি রক্ষা বোয়ালখালী আর্মি ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদ আসে যে বেংগুরা এলাকায় একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী অবস্থান করছে এবং তারা নাশকতার পরিকল্পনা করছে।
সংবাদ পাওয়ার পরপরই বোয়ালখালী আর্মি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার মেজর মো. রাসেলের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল এলাকাটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
সেনাবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অপরাধীরা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তারা গ্রেপ্তার এড়াতে পার্শ্ববর্তী একটি পুকুরে ঝাঁপ দেয়। তবে সেনাসদস্যদের বিচক্ষণতা ও কৌশলী অবস্থানের কারণে তাদের পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়। চারদিক থেকে ঘেরাও করে পুকুর থেকে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সালাউদ্দিন রুমি এবং সাইফুল ইসলাম।
উদ্ধারকৃত অস্ত্রের খতিয়ান গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি গোপন আস্তানা থেকে আধুনিক ও দেশীয় অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে ৪টি বিদেশি শটগান যা অত্যন্ত মারণঘাতী ও আধুনিক। এছাড়া রয়েছে ২টি বিদেশি পিস্তল যা সাধারণত পেশাদার খুনিরা ব্যবহার করে থাকে। এর সাথে ১৩ রাউন্ড তাজা গুলি যা সরাসরি ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এই সন্ত্রাসীরা কেবল অস্ত্র ব্যবহারকারীই নয়, তারা নিজেরা দেশীয় পদ্ধতিতে অস্ত্র তৈরি করে অপরাধী চক্রের কাছে তা চড়া দামে বিক্রি করত। বিপুল পরিমাণ লেদ মেশিন, স্প্রিং, লোহা কাটার যন্ত্রসহ দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির নানাবিধ উপকরণ উদ্ধারের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের একটি অস্ত্র তৈরির কারখানা ধ্বংস করা হয়েছে।
নির্বাচনের আগে বড় আতঙ্ক গ্রেপ্তারকৃতদের অতীত রেকর্ড বিশ্লেষণ করে সেনাবাহিনী চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে। সালাউদ্দিন রুমির বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলাসহ অন্তত ৬টি দুর্ধর্ষ অপরাধের মামলা রয়েছে এবং সে এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি ও দাঙ্গা হাঙ্গামাসহ ৪টি মামলা রয়েছে।
মেজর মো. রাসেল জানান, এই দুই সন্ত্রাসী বিগত বিভিন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র মহড়া দেওয়া এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির কাজে জড়িত ছিল। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছিল এবং নতুন করে অস্ত্র মজুত করছিল। তাদের গ্রেপ্তার বোয়ালখালী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে।
নির্বাচনী নিরাপত্তা ও সেনাবাহিনীর বার্তা গত কয়েকদিন ধরে সারা দেশে লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বোয়ালখালীর এই সফল অভিযান মূলত সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে এমন কোনো গোষ্ঠী বা অস্ত্রধারীকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিযানে বিদেশি শটগান ও পিস্তল উদ্ধার হওয়াটি প্রমাণ করে যে অবৈধ অস্ত্রের আন্তর্জাতিক রুটগুলোর সঙ্গেও এই চক্রের যোগাযোগ থাকতে পারে। উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় এগুলো কোন কোন অপরাধে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এলাকার পরিস্থিতি ও আইনি প্রক্রিয়া অভিযানের পর থেকেই বেংগুরাসহ পুরো বোয়ালখালী উপজেলায় থমথমে ভাব বিরাজ করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। স্থানীয়দের মতে, এই দুই সন্ত্রাসীর অত্যাচারে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন অতিষ্ঠ ছিল। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে নতুন করে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করে বোয়ালখালী থানায় হস্তান্তর করা হবে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো পুলিশের জিম্মায় রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রামের এই সফল অভিযান দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের জন্য একটি কড়া বার্তা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী যে বদ্ধপরিকর, বেংগুরার পুকুর থেকে সন্ত্রাসীদের পাকড়াও করার মধ্য দিয়ে তা আবারও প্রমাণিত হলো। লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী।