রাশিয়া ও ইউক্রিয়া একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, এ ধরনের সমঝোতা কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক মিত্ররা রাশিয়াকে প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে কি না, তার ওপর।
এএনআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে এবং রাশিয়াও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই পোস্টে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী ডিজেলের দাম বাড়ার পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধই প্রধান কারণ, ইরান নয়।
এর আগে রোববার জেলেনস্কির প্রতি রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও ডিজেল অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। এসব স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর জেলেনস্কি জানান, গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো সুরক্ষায় রাশিয়ার কাছ থেকে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা চায় ইউক্রেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইউক্রেন তার আন্তর্জাতিক মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন রাশিয়ার সঙ্গে এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখা সম্ভব হয়।
জেলেনস্কির ভাষ্য, খাদ্য, জ্বালানি এবং মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য মৌলিক সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি। অথচ রুশ বাহিনীর হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে এসব স্থাপনা।
তিনি বলেন, ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য ও ওষুধের গুদামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়মিত হামলা চালানো হচ্ছে। জেলেনস্কি বলেন, ‘কোনো চুক্তি মেনে চলতে রাশিয়া সত্যিই রাজি কি না, তা নিয়ে ইউক্রিয়ার আস্থা নেই।’
তার মতে, কেবল সমঝোতার ঘোষণা দিলেই হবে না। রাশিয়া দীর্ঘ সময় ধরে হামলা থেকে বিরত থাকবে, এমন নিশ্চয়তা ইউক্রেনের মিত্রদের দিতে হবে। মিত্ররা যদি নিশ্চিত করতে পারে যে ইউক্রিয়ার বিদ্যুৎব্যবস্থা, জ্বালানি স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং খাদ্য সরবরাহের পথগুলোতে রাশিয়া হামলা বন্ধ রাখবে, তাহলে ইউক্রেনও রাশিয়ার স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখতে প্রস্তুত।
তবে এ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য হতে হবে বলে জানান জেলেনস্কি। সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ রেখে পরে আবার তা শুরু করা যাবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর কিংবা দেশটির জ্বালানি চাহিদার চাপ কমে গেলেও যেন এই সমঝোতা কার্যকর থাকে, সেটিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধ অবশ্যই শেষ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করা শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মিত্রদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে রাশিয়ার শাহেদ ড্রোন মোকাবিলায় নতুন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া ধারাবাহিক পোস্টে তিনি জানান, জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ ড্রোন ঠেকাতে নতুন প্রজন্মের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরীক্ষা চলছে।
জেলেনস্কি বলেন, এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন দ্রুত প্রযুক্তিটির উন্নয়ন ও পরীক্ষার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শাহেদ মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মের ড্রোন প্রতিরোধক নিয়ে আমাদের কাজ চলছে। সমাধান রয়েছে এবং পরীক্ষা চলছে। আমরা সব প্রক্রিয়া দ্রুত করছি।’
ইউক্রেনের এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যায় উৎপাদন করাও সম্ভব হবে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভহেনি খমারা এবং ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মিখাইলো দ্রাপাতির সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলেও জানান জেলেনস্কি। দ্রুত ফল পাওয়া যায়, এমন পদক্ষেপ নিয়ে সামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং প্রকল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থলযুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেছেন জেলেনস্কি। তার দাবি, ইউক্রেনের সেনারা সম্মুখসারিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে দোনেৎস্ক অঞ্চলে লড়াইরত কয়েকটি সেনা ইউনিটের প্রশংসা করেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, তৃতীয় সেনা কোর, ৬৬তম ও ১২৫তম যান্ত্রিক ব্রিগেড এবং ৪৬তম পৃথক আকাশচলন ব্রিগেড সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তার দাবি, ইউক্রেনের সেনারা শুধু নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেনি, সক্রিয়ভাবেও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে রোববার ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি রেললাইনে রুশ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।
হামলার কিছুক্ষণ আগে ওই রেলপথ দিয়ে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও সাবেক সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্টসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যক্তি যাতায়াত করেছিলেন। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেল কর্তৃপক্ষ উক্রজালিজনিতসিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জনসন ও বিল্টকে বহনকারী কূটনৈতিক কামরাটি নির্ধারিত সময়ের আগেই ইয়াহোদিন স্টেশন ছেড়ে যায়।
ওই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি সদস্য দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও ছিলেন। তারা কিয়েভে অনুষ্ঠিত একটি নিরাপত্তা সম্মেলন থেকে ফিরছিলেন। রুশ ড্রোন হামলায় রেললাইনের কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ট্রেনে থাকা কেউ আহত হননি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, রুশ ড্রোনটির লক্ষ্য সম্ভবত কূটনৈতিক ট্রেনটি ছিল। তবে ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশন ছেড়ে যাওয়ায় হামলাটি এড়ানো সম্ভব হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। শুক্রবার দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ ডলারের বেশি হয়ে যায়, যা নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে জ্বালানির বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
গত কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে আসছে। কিয়েভের দাবি, রাশিয়ার জ্বালানি খাত থেকেই দেশটির সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য অর্থ ও জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। পাল্টা হিসেবে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে। রাতভর চালানো ড্রোন হামলায় দুই দেশেই হতাহত এবং বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আগস্টে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ডিজেল ও একই ধরনের জ্বালানির নিট রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় ওই অঞ্চল থেকে ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানির রপ্তানি কমে এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি পর্যায়ে নেমেছে।
ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।