আফ্রিকার দেশ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয় শান্তিরক্ষীর মরদেহ দেশে এসে পৌঁছেছে। শনিবার সকাল ১১টার দিকে নিহতদের বহনকারী বিশেষ ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ শান্তিরক্ষীদের মরদেহ গ্রহণ করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ, সিজিএস, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম। এ সময় সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিনিধি এবং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর, আইএসপিআর, এর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিমানবন্দরে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, আগামীকাল যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় নিহত শান্তিরক্ষীদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে মরদেহগুলো শহীদদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হবে। পরে পূর্ণ সামরিক সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হবে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই শহীদদের আত্মত্যাগ রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা হবে এবং তাদের পরিবারকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ ডিসেম্বর সুদানের আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিসফা, ইউএনআইএসএফএ, এর আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিকস বেইসে এই হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় দুপুর ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিটের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হঠাৎ করে ড্রোন হামলা চালায় সেনাঘাঁটিতে। এই আকস্মিক ও সুপরিকল্পিত হামলায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ছয় জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী এবং আহত হন আরও আট জন। হামলার পরপরই জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা হয়।
সুদানে নিহত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী হলেন, কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা, এএসসি, বাড়ি নাটোর, সৈনিক শামীম রেজা, বীর, রাজবাড়ী, সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, বীর, কুড়িগ্রাম, সৈনিক শান্ত মন্ডল, বীর, কুড়িগ্রাম, মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, কিশোরগঞ্জ এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া, গাইবান্ধা। তারা সবাই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
হামলায় আহত আট জন শান্তিরক্ষীকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অবস্থিত আগা খান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আহতদের মধ্যে রয়েছেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামান, পিএসসি, সার্জেন্ট মো. মোস্তাকিম হোসেন, বীর, কর্পোরাল আফরোজা পারভিন ইতি, ল্যান্স কর্পোরাল মহিবুল ইসলাম, সৈনিক মো. মেজবাউল কবির, বীর, সৈনিক মোসা. উম্মে হানি আক্তার, সৈনিক চুমকি আক্তার এবং সৈনিক মো. মানাজির আহসান, বীর। চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে সৈনিক মো. মেজবাউল কবিরের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। অন্যরা আশঙ্কামুক্ত এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। তাদের মধ্যে একজন ইতোমধ্যে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
সুদানে এই নৃশংস ও কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর, আইএসপিআর, থেকে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় বলা হয়, নিহত শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। শোকবার্তায় আরও বলা হয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছে। শহীদ শান্তিরক্ষীদের অবদান ইতিহাসে সম্মানের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শান্তিরক্ষীদের মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মহল ছাড়াও সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করছেন। অনেকে বলছেন, এই আত্মত্যাগ শুধু পরিবার নয়, পুরো জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকা আরও একবার রক্তের বিনিময়ে প্রমাণিত হলো। একই সঙ্গে তারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত সদস্যদের নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সামরিক সম্মান ও জাতির গভীর শ্রদ্ধায় আজ বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে তার ছয় বীর সন্তানকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য। সুদানের মাটিতে প্রাণ দেওয়া এই শান্তিরক্ষীরা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন দেশের ইতিহাসে, বিশ্বশান্তির অগ্রদূত হিসেবে।