দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে ২০২৭ সালের মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করেছে সরকার।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে ৬ জুন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই নতুন সময়সূচি ও শিক্ষা ক্যালেন্ডারের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা দূর করতেই এই আগাম ঘোষণা বলে মনে করা হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি শুরু হয়ে শেষ হবে ৬ ফেব্রুয়ারি। অন্যদিকে, উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে ৬ জুন এবং তা শেষ হবে ১৩ জুলাই। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক হাতে পাচ্ছে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, এই সময়সূচি কেবল সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের জন্য নয়, বরং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সমমানের পরীক্ষার ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে।
কেন পরীক্ষার সময়সূচিতে এই পরিবর্তন- এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় সাশ্রয় করা। অনেক সময় দেখা যায়, পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে প্রায় এক থেকে দুই বছর নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চায়, তারা সময়মতো ‘ফল সেমিস্টার’ (Fall Semester) ধরতে পারে না।
নতুন এই সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণ ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীরা কোনো সেশনজট ছাড়াই দেশি ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে। এটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এক ধাপ এগিয়ে রাখবে বলে সরকার বিশ্বাস করে।
এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত বুধবার (১৩ মে) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং এমনকি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সাথেও দীর্ঘ আলোচনা করা হয়।
সভায় উপস্থিত অংশীজনরা মত দেন যে, পরীক্ষার সময় আগে থেকে সুনির্দিষ্ট থাকলে পাঠদান প্রক্রিয়া গুছিয়ে আনা সহজ হয়। বিশেষ করে বর্ষার মৌসুম কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এড়াতে বছরের শুরুতেই এসএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রস্তাবটি অনেকেই সমর্থন করেন। সেই মতামতের ভিত্তিতেই ২০২৭ সালের এই শিক্ষাপঞ্জি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সরকারের এই আগাম ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। অভিভাবকরা মনে করছেন, জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলে গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ কিংবা বর্ষার জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে শিক্ষার্থীরা রেহাই পাবে। এছাড়া এইচএসসি পরীক্ষা জুনে শুরু হওয়াও যুক্তিযুক্ত, কারণ এতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত সময় পাবে।
তবে অনেক শিক্ষক মনে করছেন, এই সূচি বাস্তবায়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঠ্যক্রম শেষ করার ক্ষেত্রে আরও গতিশীল হতে হবে। বিশেষ করে জানুয়ারিতে পরীক্ষা নিতে হলে নির্বাচনী পরীক্ষা ও ফরম পূরণের কাজ আগের বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান যে, এটি কেবল একটি পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন নয়, বরং সামগ্রিক শিক্ষা সংস্কারের একটি অংশ। পরীক্ষা পদ্ধতিকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করা হচ্ছে যাতে প্রশ্ন ফাঁস বা উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো ত্রুটি না থাকে। দ্রুততম সময়ে ফলাফল প্রকাশের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহারের পরিকল্পনাও করছে মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর বিপুল সংখ্যায় উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমায়। ওইসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূলত সেপ্টেম্বর সেশনে বড় আকারে ভর্তি নেওয়া হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক সময় এইচএসসির ফল প্রকাশ হতে দেরি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এক বছর পিছিয়ে পড়ে। ২০২৭ সালের জুন মাসে পরীক্ষা শুরু হয়ে জুলাইয়ে শেষ হলে এবং আগস্টের মধ্যে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীরা অনায়াসেই সেপ্টেম্বর সেশনে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে পারবে।
২০২৭ সালের এই শিক্ষা ক্যালেন্ডার বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সঠিক সময়ে পরীক্ষা এবং ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে সেশনজটের অভিশাপ মুছে ফেলার এই উদ্যোগকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা।
এখন চ্যালেঞ্জ হলো, ঘোষিত এই সময়সূচি অনুযায়ী ক্লাস পরীক্ষা ও সিলেবাস শেষ করা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আশাবাদী যে, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত সহযোগিতায় ২০২৭ সালের এই মহতী পরিকল্পনা সফলভাবে সম্পন্ন হবে, যা জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।