দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন (এক লক্ষ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার রূপরেখা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্মেলনের (FICCI FDI Conference 2026) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি দেশ ও দেশের বাইরের উদ্যোক্তাদের জন্য একগুচ্ছ যুগান্তকারী প্রতিশ্রুতি দেন।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন- ব্যবসা সহজীকরণ, আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করে বাংলাদেশ সরকার নিজেই এখন থেকে বিনিয়োগকারীদের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।
ফোরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (FICCI) আয়োজিত এই সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিনিধি এবং জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য সরকারি নীতির গুরুত্ব এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
ব্যবসায়ী থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকপাত
ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের অবদানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা যারা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তারা কেবল অর্থ বিনিয়োগ করেননি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, নতুন প্রযুক্তি এনেছেন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশকে শক্তিশালী করেছেন।
নিজ জীবনের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী একটি বিরল ও আন্তরিক বক্তব্য দেন। রাজনীতিতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করার আগে নিজের ব্যবসায়ী জীবনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনীতিতে আসার আগে আমিও একজন ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলাম। আমার সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি যে, একজন উদ্যোক্তার যোগ্যতা বা রাজনৈতিক নেতাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসা সফল হয় না। ব্যবসার সাফল্য নির্ভর করে সঠিক ও সহায়ক সরকারি নীতিমালার ওপর।
তিনি উপস্থিত বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়নেই তার সরকার সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে।
আপনারা বিনিয়োগ করুন, আমরা আপনাদের ওপর বিনিয়োগ করব
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তার নতুন বার্তা স্পষ্ট করে দিয়ে বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসায়ের পরিধি বাড়ানো এবং নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য শতভাগ প্রস্তুত।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক- উভয় খাতের ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী এক শক্তিশালী অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, আপনারা যখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবেন, তখন আমাদের সরকার সময়, সহমর্মিতা এবং সঠিক নীতির মাধ্যমে আপনাদের ওপরেই বিনিয়োগ করবে। এটি কেবল মুখের কথা নয়, এটি একটি সুদৃঢ় অঙ্গীকার যা আমরা ইনশাআল্লাহ রক্ষা করব।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাদের নির্বাচিত সরকার বিপুল জনগণের সমর্থন নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই নীতির সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি।
চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অপার সম্ভাবনা ও জয়ের শক্ত ভিত
বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা অস্বীকার না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমস্যার পাশাপাশি আমাদের এমন কিছু মৌলিক শক্তি রয়েছে যা বিশ্বে বিরল।
বাংলাদেশে একটি বিশাল ও দ্রুত বর্ধনশীল অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের তরুণ, দক্ষ ও অত্যন্ত পরিশ্রমী জনশক্তি অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এর পাশাপাশি জনগণের স্পষ্ট রায়ে গঠিত একটি স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার দেশের উন্নয়ন ও বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এই চার ভিত্তির ওপর ভর করেই তৈরি হচ্ছে নতুন বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিশন। সরকার একটি নিয়মভিত্তিক (rules-based), বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত এবং বেসরকারি খাত-চালিত শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। নির্বাচনের আগেই তৈরি করা দলের ইশতেহারই এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল রোডম্যাপ বা পথনকশা হিসেবে কাজ করছে।
৫ মাসের শাসনকাল ও যুগান্তকারী সংস্কার
সরকার গঠনের মাত্র পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও নীতিগত প্রস্তুতি কিন্তু হুট করে শুরু হয়নি। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, ক্ষমতায় আসার অনেক আগেই তারা বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, বিভিন্ন চেম্বার, দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘ ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।
ব্যবসায়ীদের মূল দাবি ও সমস্যার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, শুনানির সেই পর্ব শেষ, এখন কেবলই অ্যাকশন বা বাস্তবায়নের পালা। বিনিয়োগকারীদের সুনির্দিষ্ট দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ইতোমধ্যেই একাধিক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে:
আইনি সুরক্ষা ও আইনি সংস্কার: দেশি-বিদেশি সকল বিনিয়োগের জন্য আইনি সুরক্ষা জোরদার করা হচ্ছে এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
কর ও ভ্যাট কাঠামোর আধুনিকায়ন: রাজস্ব বোর্ড ও কর ব্যবস্থাকে সহজতর করা হচ্ছে, যাতে ব্যবসায়ীদের হয়রানির শিকার হতে না হয়।
মুনাফা প্রত্যাবাসন (Profit Repatriation): বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যাতে তাদের কষ্টার্জিত মুনাফা সহজে এবং কোনো ঝামেলা ছাড়া নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যেতে পারেন, সেই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ সহজ করা হয়েছে।
ডিজিটালাইজেশন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন: সরকারি সকল সেবা পুরোপুরি ডিজিটাইজড করা হচ্ছে, যাতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য (Red Tape) দূর হয় এবং ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কার্যকর রূপ পায়।
অবকাঠামো ও জ্বালানি নিরাপত্তা: বন্দর, লজিস্টিকস এবং সামগ্রিক অবকাঠামোগত মান উন্নয়নের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতের কাজ চলছে। নবায়নযোগ্য বা সবুজ জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও অগ্রাধিকার খাত
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ ছিল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ১ ট্রিলিয়ন (এক লক্ষ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে, পরিণত করা।
এই লক্ষ্য অর্জনে সম্প্রতি ঘোষিত প্রথম বাজেটে সরকার নির্দিষ্ট কিছু ‘অগ্রাধিকার খাত’ বা Priority Sectors চিহ্নিত করেছে এবং সেসব খাতে বিশেষ প্রণোদনা ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এই খাতগুলো হলো:
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে কেবল একটি ভোক্তা বাজার নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য একটি অন্যতম উৎপাদন হাব (Manufacturing Hub) হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। একই সঙ্গে মানবসম্পদের দক্ষতা ও মেধা বৃদ্ধিতে প্রবাস ও বৈশ্বিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানো হচ্ছে।
সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই অংশীদারিত্বের ডাক
ভাষণের শেষভাগে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজকে কেবল মুনাফা অর্জনের ব্যবসায়ী হিসেবে না দেখে ‘উন্নয়নের মূল অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করার বার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যেন সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী অংশীদারিত্বের ওপর। আমি এই ঘরের প্রতিটি ব্যবসায়ী নেতাকে আহ্বান জানাই- আপনারা আমাদের এই নতুন যাত্রার সহযাত্রী হোন। আসুন, আমরা একসঙ্গে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলি যা আরও শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক, সমতাভিত্তিক এবং সর্বজনীন হবে।
আমন্ত্রণ ও আশাবাদের মধ্য দিয়ে ভাষণ শেষ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন, আমরা একসঙ্গে সমৃদ্ধি অর্জন করি, নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করি এবং একটি আধুনিক ও বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। আমাদের এই যৌথ অগ্রযাত্রায় আমি আপনাদের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি।
প্রধানমন্ত্রীর এই দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, সরকারের এই স্পষ্ট রূপরেখা ও ব্যবসায়ীবান্ধব অবস্থান আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে নতুন করে বৈদেশিক বিনিয়োগের এক বিশাল জোয়ার নিয়ে আসবে।