ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ত্রিমুখী যুদ্ধের দাবানল এখন সরাসরি আঘাত হেনেছে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ক্রমাগত বিস্ফোরণ আর পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।
বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং দামের লাগাম টেনে ধরতে দীর্ঘদিনের শত্রু রাশিয়ার ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার অঙ্গীকার করায় বিশ্ববাজারে হাহাকার শুরু হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার তিনটি কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনার পর প্রতি ব্যারেল তেলের দাম আবারও ১০০ মার্কিন ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে। এই অস্থিরতা কাঁপিয়ে দিয়েছে বিশ্বের বড় বড় সব অর্থনীতিকে।
মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ১১ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এই বিশেষ লাইসেন্স কার্যকর থাকবে। তবে এই ছাড় সবার জন্য ঢালাও নয়।
মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল সেই জাহাজগুলোই এই অনুমতির আওতায় পড়বে যারা ইতিমধ্যে রুশ তেল নিয়ে সমুদ্রে ভাসছে। স্কট বেসেন্টের মতে, এটি একটি সীমিত এবং স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এর মাধ্যমে রাশিয়া সরকার খুব বড় কোনো আর্থিক সুবিধা পাবে না, কারণ এটি কেবল ট্রানজিটে থাকা তেলের জন্য প্রযোজ্য
তেলের বাজারে এই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা তাদের ইতিহাসের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সংস্থাটি তাদের জরুরি মজুত থেকে একযোগে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এত বিশাল পরিমাণ তেল ছাড়ার ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাজারকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে আনাই এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এশীয় দেশগুলো এখন মহাবিপদে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। ফিলিপাইন তাদের আমদানিকৃত তেলের ৯৫ শতাংশই পায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
জ্বালানি সাশ্রয় করতে দেশটির সরকার সরকারি কর্মচারীদের সপ্তাহে মাত্র চার দিন অফিস করার নির্দেশ দিয়েছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এই উন্নত দেশগুলো পেট্রলের দামের ওপর প্রাইস ক্যাপ বা সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে না চলে যায়। জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাইল্যান্ড সরকারও বিশেষ ভর্তুকি ও মূল্যসীমা আরোপ করেছে।
মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বর্তমান তেলের দাম বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতির জন্য খুব একটা নেতিবাচক হবে না। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ভাবছে।
সেটি হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলের ট্যাংকারগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর মাধ্যমে সরাসরি সামরিক নিরাপত্তা বা সামরিক এসকর্ট প্রদান করা। এতে করে ইরান বা হিজবুল্লাহর হামলা এড়িয়ে নিরাপদে জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে পেন্টাগন।
রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই বার্তাই দিল যে, জ্বালানি সংকটের কাছে বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক শত্রুতা গৌণ। ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বকে কেবল যুদ্ধের ধ্বংসলীলাই নয়, বরং এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মহামন্দার মোকাবিলা করতে হতে পারে। রাশিয়ার তেলের এই সাময়িক মুক্তি কি পারবে বিশ্ববাজারকে শান্ত করতে? উত্তরটা নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির উত্তাল ঢেউয়ের ওপর।