নরসিংদীর আলোচিত ও বর্বরোচিত ধর্ষণ মামলার আসামিদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে সরকার। অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, নরসিংদীর ধর্ষণ মামলায় জড়িতদের কেউ যদি আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের শেকড় উপড়ে ফেলা হবে।
শনিবার দুপুরে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। অপরাধীদের সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
নরসিংদীতে ঘটে যাওয়া অপরাধের তীব্রতা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, গুটিকয়েক দুষ্কৃতিকারীর কারণে সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যাবে না। তিনি প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেন, মাদক, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং হানাহানির বিরুদ্ধে কোনো আপস নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি কেউ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে সেটির অপব্যবহার করে, তবে সুপ্রিম কোর্ট যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে প্রশাসনিক গতিশীলতা বজায় রাখতে গৃহীত বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপের বিষয়েও আলোকপাত করেন মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় এ পর্যন্ত যতগুলো অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিই আইন হিসেবে পাস করার জন্য সংসদে পেশ করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘আসন্ন সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রণীত ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রতিটি বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে।‘এর মাধ্যমে সরকারের কর্মকাণ্ডের আইনি বৈধতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন
দেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ‘মামলার জট’ নিয়ে মন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে বিচার বিভাগকে ঢেলে সাজানো এবং আধুনিকায়নের কাজ চলছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
ঝিনাইদহে মন্ত্রীর এই সফর ও ব্রিফিংয়ের সময় স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এক সমন্বয়ধর্মী উপস্থিতি দেখা যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ, পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজাল, জেলা বিএনপি সভাপতি এমএ মজিদ, রাশেদ খানসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আইনমন্ত্রীর এই কঠোর বক্তব্য কেবল একটি নির্দিষ্ট মামলার জন্য নয়, বরং সারা দেশে অপরাধীদের প্রতি একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। বিশেষ করে ‘শেকড় উপড়ে ফেলা’র মতো জোরালো শব্দ ব্যবহার করে তিনি এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, অপরাধীদের কোনো রক্ষাকর্তা থাকবে না।
মাদক ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বজায় রাখা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আইনমন্ত্রী মনে করেন, সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার বোধ ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। অপরাধীদের আশ্রয়দাতারা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়লে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, যা রোধ করতে সরকার বদ্ধপরিকর।
নরসিংদীর ঘটনাপ্রবাহ এবং আইনমন্ত্রীর এই সাহসী অবস্থান জনমনে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৩৩টি অধ্যাদেশ বিল আকারে পাসের ঘোষণা আইনি কাঠামোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে। তবে এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রীর এই কঠোর বার্তা মাঠ পর্যায়ে অপরাধ দমনে কতটুকু প্রভাব ফেলে।