ইসরায়েলে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। গাজায় চলমান সামরিক অভিযান, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফিলিস্তিন ইস্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও দেশটির আসন্ন নির্বাচনে এসবের চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটই বেশি প্রভাব ফেলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী ও জনমত জরিপকারীদের মতে, এই নির্বাচন ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসরায়েলি সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন
একসময় ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে ডানপন্থী ও উদারপন্থীদের প্রধান মতপার্থক্য ছিল ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে অবস্থান এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি কঠোর অবস্থান এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা নাকচ করার বিষয়ে দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
ফলে এবারের নির্বাচনে ইহুদি ভোটারদের মনোযোগ মূলত গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, বর্তমান জোট সরকারের বৈধতা এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্নের দিকে। অন্যদিকে ইসরায়েলি নাগরিকত্ব পাওয়া ফিলিস্তিনি ভোটাররা এমন একটি সরকার প্রত্যাশা করছেন, যারা তাদের ওপর চলমান সহিংসতা ও অপরাধ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বার-তালের মতে, চরম ডানপন্থী জোট সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং আল্ট্রা-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের সামরিক সেবা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোতে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো দুর্বল করার অভিযোগও নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে রয়েছে।
৭ অক্টোবরের হামলা ও নেতানিয়াহুর দায়
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এখনো ইসরায়েলি সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলছে। দেশটির গণমাধ্যমে ওই হামলার স্মৃতি নিয়মিত তুলে ধরা হলেও, এরপর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ফিলিস্তিনিদের বিপুল প্রাণহানির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমান নির্বাচনী বিতর্কে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সহাবস্থানের বিষয়টি বড় হয়ে উঠছে না। বরং ভোটারদের একটি বড় অংশ ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির দাবি তুলছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে চলমান সামরিক অভিযান ও দুর্নীতির মামলাসহ বিভিন্ন কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে। সামাজিক বিশ্লেষক ইহুদা শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, ইসরায়েলের একটি বড় অংশ এখন মূলত নেতানিয়াহুর বিকল্প খুঁজছে। বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও নেতানিয়াহুবিরোধী অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐক্যের জায়গা তৈরি করেছে। এমনকি তার নিজ দল লিকুদ পার্টির মধ্যেও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগ নিয়ে দ্বন্দ্ব
ইসরায়েলের রাজনৈতিক সংকটের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ। নেতানিয়াহু সরকারের বিচার বিভাগীয় সংস্কার উদ্যোগকে সমালোচকেরা সরকারের ক্ষমতার ওপর বিচারিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
এদিকে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভীরের মতো চরম ডানপন্থী নেতারা অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারার অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা তদারকির দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক সংস্থার বিশেষজ্ঞ মাইরাভ জনসজেইনের মতে, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্র এখন মূলত অভ্যন্তরীণ বিষয়। একদিকে ডানপন্থী জোট বিচারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চাইছে, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দলগুলো গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক সংকট
ইসরায়েলের প্রধান ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলো আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। চরম ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ আরব দলকে নিয়ে কোনো জোট গঠনকে ৭ অক্টোবরের হামলার চেয়েও ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
বিরোধী দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ এবং নাফতালি বেনেটও ভবিষ্যতে আরব দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। অথচ ২০২১ সালে তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে আরব দল রাম অংশ নিয়েছিল।
এর ফলে ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রত্যাশা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, আরব অধ্যুষিত এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সহিংসতা বেড়ে গেলেও সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একই সময়ে দখলকৃত পশ্চিম তীরে উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।
সামরিক সেবা নিয়ে হারেদিদের সঙ্গে বিরোধ
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোর একটি হয়ে উঠেছে আল্ট্রা-অর্থোডক্স বা হারেদি সম্প্রদায়ের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি।
গাজাসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সামরিক অভিযানের কারণে সাধারণ ইসরায়েলিদের সামরিক দায়িত্ব ও ঝুঁকি বাড়ছে। এর বিপরীতে হারেদি সম্প্রদায়ের বড় অংশকে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে।
হারেদি রাজনৈতিক দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম সামরিক বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের বক্তব্য, নিয়মিত তোরাহ অধ্যয়ন ইসরায়েলের আধ্যাত্মিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অবস্থানের বিরুদ্ধে জেরুজালেমে হারেদি তরুণদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা সাধারণ ইসরায়েলিদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—একটি জনগোষ্ঠী কেন একই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে। ফলে সামরিক সেবা নিয়ে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের মধ্যে বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে।
ফিলিস্তিন ইস্যু আড়ালেই
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন ঘিরে গণতন্ত্র, বিচার বিভাগ, নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, সামরিক সেবা, সামাজিক মেরুকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েই মূল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জীবন-জীবিকা, স্বাধীন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা এবং ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও অধিকার নির্বাচনী আলোচনার মূলধারা থেকে অনেকটাই আড়ালে রয়েছে।
ফলে নির্বাচনের ফলাফল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনলেও ফিলিস্তিনিদের জন্য তা কতটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।