বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনে উপনির্বাচন ও পুনঃতফসিল হওয়া ভোট আগামী ১৪ এপ্রিলের আগেই সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। রোববার কমিশন সূত্রে জানা যায়, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি সময়সীমা বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি আসনের পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও আইনি কাঠামোর ভেতরেই দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বগুড়া-৬ আসনটি শূন্য হয়েছে একজন নির্বাচিত সদস্যের পদত্যাগের কারণে, আর শেরপুর-৩ আসনে বৈধ প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় পূর্বঘোষিত নির্বাচন স্থগিত করতে হয়েছিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ আসনেও বিজয়ী হন। সংবিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তি একাধিক আসনে নির্বাচিত হলে একটি আসন রেখে অন্যটি ছাড়তে হয়। সে অনুযায়ী গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বগুড়া-৬ আসনের প্রতিনিধিত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র জমা দেন। কমিশন একই তারিখ থেকে আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই বিধান মেনেই বগুড়া-৬ আসনে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) আসনে ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে কিডনিজনিত জটিলতায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল। তাঁর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করতে বাধ্য হয় কমিশন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের আগে কোনো বৈধ প্রার্থী মারা গেলে সংশ্লিষ্ট আসনের নির্বাচন স্থগিত বা পুনঃতফসিল করার বিধান রয়েছে। সেই আইন অনুসারেই ইসি শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত করে। এখন পুনঃতফসিল ঘোষণা করে নতুন করে ভোট আয়োজন করা হবে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, দুটি আসনের নির্বাচন একই সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রশাসনিক ও লজিস্টিক ব্যয় কমানো যায় এবং আইনগত জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয়। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রোজার মাস ও পহেলা বৈশাখের ছুটির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১৪ এপ্রিলের আগেই ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হচ্ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের ফলাফল প্রকাশিত হয়। এতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জোটের শরিক দলগুলো অতিরিক্ত ৩টি আসনে জয় লাভ করে। ফলে সরকার গঠনে তাদের কোনো জটিলতা হয়নি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়ী হয়েছেন এবং বাকি একটি আসনে জয় পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন ফলাফলের ওপর সংসদের সামগ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বড় প্রভাব পড়বে না। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে এ দুই আসনের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে বগুড়া-৬ আসনটি বিএনপির জন্য প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে, কারণ দলের শীর্ষ নেতা এখান থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বগুড়া-৬ আসনে উপনির্বাচনে বিএনপি কাকে মনোনয়ন দেবে, তা নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরামর্শেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। অন্য দলগুলোর পক্ষ থেকেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম আলোচনায় আসছে।
শেরপুর-৩ আসনের ক্ষেত্রেও নতুন করে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। জামায়াতে ইসলামী নতুন প্রার্থী ঘোষণা করবে কি না, নাকি জোটগত সমঝোতায় অন্য কোনো দলকে সমর্থন দেবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। স্থানীয় নেতারা বলছেন, প্রার্থী নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুনঃতফসিল ঘোষণার আগে ভোটার তালিকা, কেন্দ্র তালিকা ও সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতি যাচাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নির্বাচনী সরঞ্জাম সরবরাহ এবং পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
আইন অনুযায়ী, সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজন বাধ্যতামূলক। একইভাবে প্রার্থী মৃত্যুর ঘটনায় স্থগিত নির্বাচন পুনরায় তফসিল দিয়ে আয়োজন করতে হয়। কমিশন বলছে, তারা আইন মেনেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোট সম্পন্ন করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, দ্রুত উপনির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তাদের কার্যকর অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর এটি হবে প্রথম উপনির্বাচন, ফলে কমিশনের প্রশাসনিক দক্ষতারও একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের ভোটাররা বলছেন, দ্রুত নির্বাচন হলে তাদের প্রতিনিধিত্বের শূন্যতা দূর হবে। বিশেষ করে বগুড়া-৬ আসনের ক্ষেত্রে সংসদে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব না থাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন ১৪ এপ্রিলের আগেই দুটি আসনে ভোট আয়োজনের যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সরবতা দেখা দিয়েছে। এখন তফসিল ঘোষণার অপেক্ষা। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেই শুরু হবে প্রার্থিতা দাখিল, বাছাই, প্রতীক বরাদ্দ ও প্রচারণা। এরপরই ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের নতুন প্রতিনিধিরা।