বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে প্রথমবারের মতো সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ক্রিটিক্যালিটি সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নতুন এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলো।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন এ সাফল্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বায়রার চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মইনুল হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানের কাছে ফিজিক্যাল টেস্ট শুরুর প্রয়োজনীয় লাইসেন্স হস্তান্তর করেন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই অনুমোদনের ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিটে রিঅ্যাক্টরের ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে বড় কোনো বাধা নেই। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে।
ইতোমধ্যে প্রথম ইউনিটের প্রেসারাইজড অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি) ব্যবস্থার সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অতিক্রম করেছে কেন্দ্রটি।
এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ১৬ দশমিক ১ এমপিএ চাপ ও ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পিওআরভি/পিওএসভি ব্যবস্থার ১২টি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে পরীক্ষার সময় প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও পরে তা সমাধান করে পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করা হয়।
এনপিসিবিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ৭ অক্টোবর রাতে জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন শুরু হবে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে তার নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রূপপুর প্রকল্পের পরবর্তী বড় মাইলফলক হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ ধাপসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। ফলাফল সন্তোষজনক হলে পর্যায়ক্রমে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপের পর কেন্দ্রটি ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ সময় ধীরে ধীরে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো, টারবাইনের সঙ্গে সমন্বয় এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ করা হবে। এ জন্য পরিচালনাকারী সংস্থাকে বায়রার কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।
পুরো প্রক্রিয়ায় রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি বায়রা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডসংশ্লিষ্ট সংস্থা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক বাহিনী এবং নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রথম ইউনিটকে প্রাথমিকভাবে কম শক্তিতে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদনক্ষমতা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। গ্রিডে সংযুক্ত হওয়ার পর পরীক্ষামূলক উৎপাদন সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত চলতে পারে।
বাণিজ্যিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হবে।
রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়ানোর কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ না থাকলেও ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।