শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ০৮:৫০ অপরাহ্ন
Title :
ফ্রান্সে স্বাস্থ্যমন্ত্রী’র সংবর্ধনা অনুষ্ঠান স্থগিত: প্রবাসী মহলে ব্যাপক আলোচনা চীনের বিনিয়োগের পাশাপাশি আমাদেরও রপ্তানির সুযোগ রয়েছে: মাহদী আমিন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে সরকার কাজ করছে: প্রতিমন্ত্রী টুকু মধুপুরে কূপে নিহত চারজনের পরিবারকে এক লাখ টাকা সহায়তা ১ টাকার দুর্নীতি বের করতে পারলে ইস্তফা দেবো: সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহ ঢাকা-বেইজিংয়ের মধ্যে ২ চুক্তি ও ১৩ সমঝোতা স্মারক সই চীনকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাশিয়া, চীন ও তুরস্ককে আমি যুদ্ধের বাইরে রেখেছি: ট্রাম্প শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের বৈঠক লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে আদ্-দ্বীনের আপিল

৭ মার্চের বজ্রকণ্ঠ থেকে স্বাধীন বাংলার সমান্তরাল শাসন: প্রতিরোধের মহাকাব্য

  • Update Time : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ১৪৫ Time View

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহটি ছিল বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গতিশীল ও নাটকীয় সময়। ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ঘোষণা করলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নামমাত্র কর্তৃত্বও মুছে যেতে শুরু করে। ৮ মার্চ থেকে ১৪ মার্চের সেই সাতটি দিন ছিল মূলত একটি জাতির রাষ্ট্র হওয়ার বাস্তব মহড়া।

৭ মার্চের ভাষণের পর পূর্ব বাংলার শাসনব্যবস্থা আর ইসলামাবাদ বা রাওয়ালপিন্ডি থেকে পরিচালিত হচ্ছিল না, তার নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে। ৮ মার্চের ভোরের সূর্য যখন উদিত হলো, তখন প্রতিটি বাঙালির চোখেমুখে ছিল এক অদম্য প্রত্যয়। বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত চার দফা দাবি যথা সামরিক শাসন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, গণহত্যার বিচারবিভাগীয় তদন্ত এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়ে উঠেছিল জাতীয় আন্দোলনের মূল ভিত্তি। এটি আর কেবল রাজনৈতিক সভা সমাবেশে সীমাবদ্ধ ছিল না।

বঙ্গবন্ধু যে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, তা ছিল এক অভূতপূর্ব প্রশাসনিক বিপ্লব। সচিবালয় থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট দোকান পর্যন্ত সবকিছুই চলত আওয়ামী লীগের নির্দেশনায়। খাজনা ও কর বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে বাঙালি জাতি সেদিন পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের আইনি ভিত্তিকেই চুরমার করে দিয়েছিল।

আন্দোলন চলাকালে একটি অঞ্চলকে কীভাবে সচল রাখতে হয়, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি প্রশাসন, অর্থনীতি ও যোগাযোগ রক্ষার জন্য যে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনামা জারি করেছিলেন, তা ছিল মূলত একটি ছায়া সরকারের ঘোষণা। ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ পাচার রোধ করা হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কেবল পূর্ব বাংলার ভেতরেই যোগাযোগ সচল রাখতে।

এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে প্রশাসনিক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল স্তম্ভ হলো তার আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগ। কিন্তু একাত্তরের মার্চে এই দুই স্তম্ভই পাকিস্তানের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। সিএসপি ও ইপিসিএস কর্মকর্তারা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।

সবচেয়ে বড় চমকটি ছিল বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে। নবনিযুক্ত গভর্নর জেনারেল, যাকে ইতিহাসের কসাই হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, সেই জেনারেল টিক্কা খানকে শপথ বাক্য পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী।

তিনি নিজেকে অসুস্থ দাবি করে এক নীরব কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রতিবাদী নজির স্থাপন করেন। হাইকোর্ট ভবনসহ সর্বত্র কালো পতাকা উত্তোলন ছিল বিশ্ববাসীর কাছে এক জোরালো বার্তা যে বাঙালি আর পরাধীনতা মানবে না।

মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালির রাজনৈতিক ঐক্য ছিল হিমালয়সম দৃঢ়। ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির বা ন্যাপ প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানান। তাঁর সেই ঐতিহাসিক উক্তি আজও বাঙালির রক্তে দোলা দেয় যে আপোসের দিন চলে গেছে।

মুজিব যদি আপোস করে, তবে ভাসানীর মতো তোমরাও তাঁর চামড়া ছিঁড়ে নিবে। এখন লড়াইয়ের পথ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। ভাসানীর এই কঠোর অবস্থান একদিকে বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছিল, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে বাংলার প্রতিটি প্রান্ত আজ একবিন্দুতে মিলিত।

মুক্তিকামী মানুষের এই মিছিলে সামিল হয়েছিলেন শিল্পীরাও। জয়নুল আবেদিন পাকিস্তান সরকারের দেওয়া হিলাল ই ইমতিয়াজ খেতাব বর্জন করে নিজের দেশপ্রেমের প্রমাণ দেন। সবচেয়ে বড় ত্যাগ ছিল সাধারণ মানুষের। দরিদ্র রিকশাচালক থেকে শুরু করে কলকারখানার শ্রমিক, সবাই তাঁদের এক দিনের আয়ের টাকা শহীদ পরিবার সাহায্য তহবিলে দান করেছিলেন। এই গণ অংশগ্রহণই ছিল আসন্ন সশস্ত্র যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি।

যখন পূর্ব বাংলা অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল, ঠিক তখন পর্দার আড়ালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিচ্ছিল চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞের প্রস্তুতি। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খাদ্যবাহী জাহাজ সরিয়ে নেওয়া ছিল কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে বাঙালির মনোবল ভাঙার এক হীন পরিকল্পনা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরেছিল আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও।

জাতিসংঘ তাদের কর্মীদের ঢাকা থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করে, বিদেশি দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানি ধনী ব্যক্তিরাও পিআইএ এর বিশেষ ফ্লাইটে করে ঢাকা ছাড়ছিলেন। বাতাসের গন্ধেই সেদিন বোঝা যাচ্ছিল এক প্রলয়ংকরী ঝড় ধেয়ে আসছে।

সপ্তাহের শেষ দিকে সামরিক জান্তা আবারও দমনের পথে হাঁটে। ১৩ মার্চ ১১৫ নম্বর সামরিক আদেশের মাধ্যমে বেসামরিক কর্মচারীদের কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং অমান্যকারীদের সামরিক আদালতে বিচারের হুমকি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু সেই নির্দেশ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন।

অন্যদিকে, জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচিতে বসে দুই অংশে দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এর বিতর্কিত দাবি তোলেন, যা আসলে সামরিক জান্তাকে শক্তি প্রয়োগের অজুহাত করে দিয়েছিল।

১৯৭১ সালের ৮ থেকে ১৪ মার্চের সেই দিনগুলো ছিল মূলত একটি স্বাধীন দেশের সফ্ট লঞ্চ বা প্রাথমিক যাত্রা। সমান্তরাল প্রশাসন আর জনগণের অভূতপূর্ব ঐক্য প্রমাণ করেছিল যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির মৃত্যু এই ভূখণ্ডে ঘটে গেছে অনেক আগেই, কেবল আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ছিল সময়ের ব্যাপার। ৭ মার্চের সেই বজ্রধ্বনি কেবল রেসকোর্স ময়দানেই থামেনি, তা বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল এক অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর দিকে তাকালে আমরা গর্ব অনুভব করি এই ভেবে যে আমাদের পূর্বপুরুষরা কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং বুদ্ধিমত্তা ও সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক বিদ্রোহের মাধ্যমে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category