সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১২:৫২ অপরাহ্ন

দেশে ঋণ খেলাপির পাহাড়: ছাড়াল সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৮৭ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বহুদিন ধরেই যে অস্থিরতা ও আস্থাহীনতা জমে উঠছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি এখন খেলাপি ঋণের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছানো। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়। যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করে। নতুন হিসাব দেখায়, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে আরও ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। যা একইসঙ্গে পরিস্থিতির অবনতির গতি-প্রকৃতির দিকটিও পরিষ্কার করে।

ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা অনেক দিন ধরেই বলছিলেন, ক্ষমতাচ্যুত আগের সরকার তথা আওয়ামী লীগের শাসনামলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাব কম দেখানোর প্রবণতা ছিল প্রবল। নানা ব্যাখ্যা, নীতি পরিবর্তন কিংবা বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের চাপ কাগজে-কলমে কম দেখানো হলেও বাস্তবতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য ছিল না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র চাপা দেওয়ার নানা চেষ্টা হয়েছিল। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তথ্য তুলে ধরছে বলে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশ হওয়া অবাক করার মতো নয়।

তার মতে, পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, অচিরেই এই হার ৪০ শতাংশ ছুঁয়ে যেতে পারে।

ব্যাংকারদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বড় শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঋণ পরিশোধে অনিচ্ছাই এই সংকট আরও গভীর করেছে।

তাদের মতে- এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হলমার্ক গ্রুপ।

সহ বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ বহু বছর ধরে রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি কেলেঙ্কারি তো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ব্যাংকগুলোর সক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ব্যাংকারদের বক্তব্য, এসব অনিয়ম ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে; যার ফল হিসেবে আজ ব্যাংক খাতে বিপুল খেলাপির বোঝা জমে আছে।

১৯৯০–এর দশকের শেষে, অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে দেশে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪১ শতাংশের বেশি। পরে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগে ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশে। কিন্তু এ সময়ের পর বড় বড় ঋণ জালিয়াতি, রাজনৈতিক চাপ, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহারে আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে খেলাপি ঋণ।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সময় মোট খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা যা বর্তমানে দাঁড়িয়ে গেছে প্রায় ৩০ গুণ বেশি।

এ থেকে স্পষ্ট এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও শিথিল তদারকি ব্যাংক খাতে ঝুঁকিকে জটিল করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এখন থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–আইএমএফ–এর পরামর্শ অনুযায়ী খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করছে।

এই পদ্ধতিতে- আগের মতো ঋণ পুনঃতফসিল করা মাত্রই খেলাপি ‘মুক্ত’ দেখানো যায় না, ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ, অনাদায়ী বা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়গুলো আলাদাভাবে বিবেচনায় আনা হয়, ঋণগ্রহীতার প্রকৃতি ও ঝুঁকিমান অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করতে হয়।

এসব কারণে খেলাপি ঋণের প্রকৃত আয়তন এখন পরিষ্কারভাবে উঠে আসছে, যা অনেককেই বিস্মিত করলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এটাই বাস্তবতা।

বিশ্লেষকদের মতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণের পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব’ প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা সময়মতো টাকা ফেরত না দিলেও তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণেও প্রভাব বিস্তার করেছেন তারা।

দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি, ব্যাংক কোম্পানি আইন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নীতিমালা বারবার দুর্বল করা হয়েছে, যা অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়েছে।

ঋণ পুনঃতফসিলে অপব্যবহার, একাধিকবার পুনঃতফসিল করা, স্বল্প জামানতে বিশাল ঋণ বিতরণ এবং কাগজপত্রে সুবিধা দেখানো এসব কারণে খেলাপির পরিমাণ কৃত্রিমভাবে কম দেখানো হয়েছিল।

জালিয়াতি ও দুর্নীতি- হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি এসব মামলায় হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।

কোভিড–পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা সংকটও খেলাপি বৃদ্ধির পেছনে পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম মনে করেন, ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলায় ফেরাতে কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছাড়া বিকল্প নেই।

তার প্রস্তাব- প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপির বিরুদ্ধে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। বিশেষ আদালত না হলে এই সংকট কাটবে না।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের আরও কিছু প্রস্তাব আছে- ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ, ঋণ অনুমোদন ও তদারকিতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, বড় খেলাপিদের জামানত বাজেয়াপ্ত ও সম্পত্তি নিলামে তোলা, ঋণ পুনঃতফসিল নীতিকে কঠোর করা, ব্যাংকিং খাতে স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল নজরদারি কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে কয়েকটি ঝুঁকি এগিয়ে আসতে পারে- ব্যাংকের তারল্য সংকট আরও বাড়বে, আমানতকারীদের আস্থা কমে যাবে, বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দেবে, সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধীরগতি তৈরি হবে

সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়বে, ফলে জনগণকে ভর্তুকি দিয়ে ক্ষতি পোষাতে হতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন এক রকম ‘রূপান্তরের মোড়’ এ দাঁড়িয়ে আছে। স্বচ্ছতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনিয়ম, প্রভাব, জালিয়াতি ও দুর্বল তদারকির ফল এখন স্পষ্ট। খেলাপি ঋণের স্তুপ শুধু ব্যাংক খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তথ্য প্রকাশ পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে। এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ যাতে ব্যাংক খাত আবারও স্বাভাবিকতার পথে ফিরতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category