ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা। হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। অধিকাংশ হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে খালি নেই শয্যা। অনেক হাসপাতালে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। এ অবস্থায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দাবি, তারা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানামুখী কর্মসূচি পরিচালনা করছেন, নিয়েছেন বিভিন্ন উদ্যোগ। তবে আপাতদৃষ্টিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতির বাড়বাড়ন্ত রূপ বলছে এসব উদ্যোগের ফলাফল প্রায় ‘শূন্য’।
রাজধানীতে ডেঙ্গুর এমন নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হলেও মশা নিধনে তেমন কিছুই করতে পারছে না ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তাদের মশা নিধনে কোনো পদ্ধতিই কাজে লাগছে না। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।তবে আগামী আগস্ট, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ববিদরা। তারা জানান, বর্ষা মৌসুমে সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কারণ, যেখানেই বৃষ্টির পানি জমছে, সেখানেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। আবার এমন কিছু জায়গায় এডিস মশা প্রজনন করছে, যেখানে বৃষ্টির পানির সম্পর্ক নেই। এর মধ্যে রয়েছে বহুতল ভবনের পার্কিংয়ের জায়গা, নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্ট, ওয়াসার মিটার বাক্স এবং বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানি।নগরে মশা নিধন বা নিয়ন্ত্রণ সিটি করপোরেশনের অন্যতম প্রধান কাজ। কিন্তু ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি এ কাজে ব্যর্থ বলে মনে করেন নাগরিকরা। তবে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দাবি, সাধারণত এডিস মশা বাসাবাড়ির আঙিনায় পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। এক্ষেত্রে প্রত্যেক বাসায় ঢুকে এডিস মশা নিধনের সক্ষমতা করপোরেশনের নেই। তাই এ মশা নিধনে নগরের সব বাসিন্দাকে সচেতন হতে হবে। নিজ বাড়ির আঙিনা নিজেকেই নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। জনসচেতনতা ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ বা নিধন সম্ভব নয়।মশা নিয়ে জনসচেতনা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি প্রচারণা বা কর্মসূচি চালাচ্ছে ডিএনসিসি। তারা স্কুলে পাঠ্যপুস্তকে এডিস ও কিউলেক্স মশা নিয়ে জনসচেতনতামূলক অধ্যায় যুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব করেছে। মশা নিয়ে গবেষণায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ডিএনসিসির সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। স্কুল-কলেজে ফ্রি বিলি করতে মশা সচেতনতার এক লাখ কার্টুন বই ছাপানো হয়েছে। এছাড়া ঢাকা উত্তরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চলছে।
এমন উদ্যোগের পরও ডিএনসিসি এলাকায় মশার উপদ্রব লাফিয়ে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা নিতে ডিএনসিসির উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তেজগাঁও ও বাড্ডা এলাকার রোগী বেশি যাচ্ছে। একই ভাবে ডিএসসিসির যাত্রাবাড়ী, মুগদা, কদমতলী, জুরাইন, ধানমন্ডি ও বাসাবোতে ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হচ্ছে বেশি।
সোমবার (২৪ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের ইনচার্জ ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম সই করা ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার (২৩ জুলাই) সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুই হাজার ২৯৩ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা এক হাজার ২৩৮ ও ঢাকার বাইরের এক হাজার ৫৫ জন। এছাড়া সোমবার (২৪ জুলাই) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮৫ জনে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৫ হাজার ২৭০ জন। এর আগে ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২৮১ জন মারা যান। ওই বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ডেঙ্গুতে ২৭ জনের মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে আলোচ্য বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৬২ হাজার ৩৮২ জন।
২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গু সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। একই বছর দেশব্যাপী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার জাগো নিউজকে বলেন, আগে বর্ষা মৌসুমে এডিস মশা বংশবিস্তার করতো। এখন সারা বছরই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুর জন্য আরও ভয়াবহ হবে।