যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় শুক্রবার (১৫ আগস্ট) বৈঠকে বসবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এ বৈঠকটি পুতিনের জন্য এক অর্থে বিজয়স্বরূপ। একেবারে বৈঠকে বসার স্থান থেকে শুরু করে সবকিছুই তার পক্ষে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পুতিন আসলে কী করতে চাইছেন?
প্রথমে আসা যাক বৈঠকের স্থানটি নিয়ে। আলাস্কায় বৈঠক হওয়ার বিষয়টি পুতিনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আলাস্কা একসময় রাশিয়ার হাতে ছিল। পরে ১৮৬৭ সালে তা বেশ স্বল্পমূল্যে কেনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসে। বিষয়টি এখনো অনেক রুশ জাতীয়তাবাদীই মেনে নিতে পারেন না। এদের অনেকেই পুতিন ও ইউক্রেন যুদ্ধের কট্টর সমর্থক। ফলে পুতিনের ওই অঞ্চলে বৈঠকে বসার বিষয়টি তাদের জন্য ভিন্ন অর্থ বহন করছে। ইতোমধ্যেই রুশ গণমাধ্যমের খবরে ‘আমাদের আলাস্কা’ শব্দ দুটি উচ্চারিত হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বসাটিকেই যে ক্রেমলিন বিজয় হিসেবে দেখছে, তা তাদের লোকজনও বলতে শুরু করেছেন। এ প্রসঙ্গে ক্রেমলিন সমর্থক সামরিক ব্লগার আলেক্সান্ডার কটস লিখেছেন, ‘কেউ আর রাশিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলছে না বা আমাদের কৌশলগত পরাজয় নিয়ে কিছু বলছে না।’ অর্থাৎ যেখানে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসছে, সেখানে রাশিয়ার আর একঘরে হয়ে থাকার প্রশ্নই আসছে না। তিনি আরও দাবি করেন, আলাস্কার বৈঠক ঐতিহাসিক কিছুতে পরিণত হওয়ার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, মস্কো ইউক্রেন প্রশ্নে চাইছে যে কিয়েভ তাদের দনবাস অঞ্চল রাশিয়াকে দিয়ে দিক। এটি হলে যুদ্ধবিরতি হবে। পুতিন বৈঠক চলাকালীন নিজ দাবিতে অটল থাকবেন, এমনটিই ধারণা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সাম্প্রতিক সময়ে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা থেকে মনে হয় যে পুতিনের ভূখণ্ড চাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে তার কোনো আপত্তি থাকবে না। আলোচনার টেবিলে ইউক্রেন নেই। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোও নেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কী ধরনের প্রস্তাব আসে ও তা মানতে বাধ্য করা হয়, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে। ইউক্রেন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মতে, এমন কোনো প্রস্তাব ট্রাম্প সামনে নিয়ে আসতে পারেন, যা ইউক্রেনের জন্য ভালো না-ও হতে পারে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তো প্রকাশ্যেই বলেছেন যে তারা ভূখণ্ড ছাড়বেন না। কারণ পুতিন শান্তি চান না।
এখন পর্যন্ত ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে খুব একটা ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। রাশিয়া বরাবরই দাবি করে এসেছে যে যুদ্ধের ময়দানে তারা এগিয়ে রয়েছে। তারা নিজেদের আলাপেও বারবারই সেটি তুলে ধরেছে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসার বিষয়টিকে পুতিন দেখছেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিকঠাক করার একটি সুন্দর সুযোগ হিসেবে। বর্তমানে ইউক্রেনের ভাগ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্কের বিষয়টি যেভাবে নির্ভর করছে, এ বিষয়টিকেও বদলে দিতে চাইছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং মহাকাশবিষয়ক নানা ধরনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী রাশিয়া। এমনকি মেরু অঞ্চল ও অন্যান্য স্থানে অবকাঠামো ও জ্বালানি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আকর্ষণীয় চুক্তিও করতে চাইছে দেশটি।
এরই মধ্যে এসবের নানা ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যেমন- ক্রেমলিনের শীর্ষ অর্থনৈতিক দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ পুতিনের সঙ্গে আলাস্কায় বৈঠকে অংশ নেবেন। তিনি রাশিয়ার প্রতিনিধিদলে আছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তি নিয়ে যে আলাপ হতে পারে, তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আর পুতিন যেভাবে চাইছেন, সেভাবে তিনি যদি সবকিছু করতে পারেন, তাহলে ইউক্রেন ইস্যুটি হয়ে যাবে দুই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতার হাজারও আলোচ্য বিষয়বস্তুর একটি। এটি আর মূল ইস্যু থাকবে না। গুরুত্বও সেভাবে পাবে না। এগুলো বিচার করে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পুতিন ইউক্রেন ইস্যুটিকেই কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বহীন করে তুলতে চাইছেন।
ট্রাম্প অবশ্য আগেই জানিয়েছেন, এবার হয়তো ইউক্রেনের শান্তিবিষয়ক কোনো সিদ্ধান্ত আসবে না বৈঠক থেকে। বরং অপর পক্ষের বক্তব্য শোনার ওপরই জোর দিচ্ছেন তিনি। তবে গোটা ঘটনা যেদিকেই গড়াক না কেন, বৈঠকের রেশ যে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের সমীকরণে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে, তা অনুমান করা যাচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন