সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ পূর্বাহ্ন
Title :
মিয়ানমারের ওপর চাপ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়: শামা ওবায়েদের তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে: প্রতিমন্ত্রী টুকু মহেশখালীতে বসছে আরও তিনটি এলএনজি টার্মিনাল ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী কে এই আইজেনকট, ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাঁর অবস্থান কী? সৌদি আরবের আরামকো টাওয়ারে বিস্ফোরণ, উড়ে গেছে দরজা-জানালার কাচ সৌদিতে দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক দেশে খাদ্য মজুদ ২২ লাখ মেট্রিক টন: খাদ্যমন্ত্রী চীনের অটোমোবাইল জায়ান্ট বিওয়াইডি ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ড অব দ্য ইয়ার’ এর স্বীকৃতি পেয়েছে: বিওয়াইডির নতুন মাইলফলক অর্জন জ্বালানি ও কৃষি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা-মস্কো সমঝোতা বগুড়ার ধুনটে ইয়াবাসহ দুই ব্যক্তি গ্রেপ্তার

যুদ্ধবিরতির মাঝে হরমুজ সংকট ও ইসরায়েলি সাবোটাজের শঙ্কা: মার্কিন-ইরান চুক্তি

  • Update Time : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ১১০ Time View

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে বিধ্বংসী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা গত ১৭ জুন একটি নাটকীয় মোড় নেয়।

পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দূরবর্তীভাবে একটি ১৪ দফার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষর করেন যা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামে পরিচিত।

বর্তমানে কাতারের রাজধানী দোহায় এই চুক্তির বাস্তবায়ন ও একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির রূপরেখা তৈরিতে দুই দেশের ‘প্রযুক্তিগত স্তরের’ পরোক্ষ আলোচনা চলছে। তবে মাঠপর্যায়ে এখনো উত্তেজনা কমেনি।

একদিকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের অনমনীয় অবস্থান, অন্যদিকে ইসরায়েলের তীব্র বিরোধিতা- সব মিলিয়ে এই শান্তি প্রক্রিয়া এক সুতোয় ঝুলছে।

মার্কিন-ইরান চুক্তিতে কী রয়েছে?

ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি নয়, বরং এটি ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার একটি প্রাথমিক ফ্রেমওয়ার্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেবে এবং উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলা বন্ধ রাখবে।

বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত ও নিরাপদভাবে খুলে দেওয়া। চুক্তির প্রাথমিক শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের অবরুদ্ধ ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রথম ধাপে ‘৬ বিলিয়ন ডলার, ছাড় করার প্রক্রিয়া চলছে। দোহা আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধি দল এই অর্থ ছাড়ের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) নজরদারিতে ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (HEU) ডাউন-ব্লেন্ড বা নিষ্ক্রিয় করতে সম্মত হয়েছে।

লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সমান্তরাল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করাও এই চুক্তির একটি প্রচ্ছন্ন অংশ।

দোহার পরোক্ষ আলোচনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছিলেন যে, দোহায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি (Face-to-face) বৈঠক হতে যাচ্ছে। তবে কাতার এবং ইরান উভয় পক্ষই এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে।

বাস্তবতা হলো, দোহায় কোনো উচ্চপর্যায়ের সরাসরি রাজনৈতিক বৈঠক হচ্ছে না। মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। অন্যদিকে কাজেন গরিবাবাদীর নেতৃত্বে ইরানি টেকনিক্যাল টিম কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সাথে বসছে। কাতার ও পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে, যা মূলত চুক্তির খুটিনাটি বাস্তবায়নের ‘প্রযুক্তিগত আলোচনা।

ইরানের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার

চুক্তি সই হলেও পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা কমেনি। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী তাদের ‘ক্ষমতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, এবং এর ওপর তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।

ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর কর বা ফি আরোপ করতে চায় এবং নিজেদের নির্ধারিত সীমানা অনুসরণে বাধ্য করতে চায়। সম্প্রতি একটি বিদেশি কনটেইনার জাহাজ ইরানি কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত রুটের বাইরে অগভীর পানিতে গিয়ে আটকে গেছে।

যদিও সাময়িকভাবে যান চলাচল শুরু হয়েছে, কিন্তু গত সপ্তাহেও মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সেন্টকম (CENTCOM) ইরানের ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, যার জবাবে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে রকেট ছোড়ে।

এই অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং ইউনিয়নগুলো হরমুজ প্রণালীকে ‘যুদ্ধ অঞ্চল’ (War Zone) হিসেবে পুনর্বহাল রেখেছে, যার ফলে এই রুটে জাহাজের বিমা ও নাবিকদের খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৪টিরও বেশি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে এবং ১৪ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।

ইসরায়েল কি এই চুক্তি ভেস্তে দিতে পারে?

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। এমনকি তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনীকে’ মৃত্যুর জন্য চিহ্নিত(Marked for death) বলে ঘোষণা করেছেন।

ইসরায়েলের মূল ভয় হলো, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে এবং পুনরায় হিজবুল্লাহ ও হামাসকে পুনর্গঠিত করবে।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি

ইসরায়েলি হুমকির জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, ইসলামাবাদ সমঝোতার শর্তগুলো সবার সামনে পরিষ্কার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট (POTUS) প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি তেল আবিবে তাঁর ‘পোষা প্রাণীদের’ (ইসরায়েল) মুখ বেঁধে রাখবেন। তারা যদি তাদের প্রভুর কথা না শোনে, তবে ইরান তাদের উচিত শিক্ষা দেবে।

ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী বা নতুন নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো, যা ইরানকে আবার সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য করবে। তাছাড়া ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা বা রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোতে বড় ধরনের সাইবার আক্রমণ (যেমন স্টাক্সনেটের মতো) করা।

হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বাড়িয়ে দিয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়া। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও স্বীকার করেছেন যে, এত বড় যুদ্ধের পর বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ আসবেই, বিশেষ করে যেখানে ইসরায়েলের মতো পক্ষগুলো জড়িত।

ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি (MoU) মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয় থেকে সাময়িক রক্ষা করলেও এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই কূটনৈতিক যুদ্ধবিরতি মূলত দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে তৈরি হয়েছে।

দোহায় চলমান আলোচনা যদি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ফ্রিজড ফান্ডের জট ছাড়াতে না পারে, আর ওয়াশিংটন যদি ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে এই ৬০ দিনের শান্তিপ্রক্রিয়া শেষে মধ্যপ্রাচ্য আরও ভয়াবহ এক আঞ্চলিক যুদ্ধের মুখে পড়তে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category