ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী রাজনীতিক গাদি আইজেনকট। ১২০ সদস্যের নেসেটে ৬৭ আইনপ্রণেতার সমর্থন পেয়ে সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সময় শনিবার (০৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। রোববার (০৮ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে এ দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং যুদ্ধনীতি নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে আইজেনকটকে তুলনামূলক সংযত ও পেশাদার নেতা হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজা যুদ্ধের বিষয়ে তার অবস্থান কতটা ভিন্ন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে তার অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।
নির্বাচনের পর আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সংসদ সদস্যসহ ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকটের প্রতি সমর্থন জানান। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন দেন ৪৬ জন। আইনপ্রণেতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন বিবেচনায় নিয়ে আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের সবচেয়ে বড় পার্থক্য তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি। তাকে সৎ, সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং তুলনামূলক সংযত রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক নীতির পার্থক্য কতটা, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রশ্নে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
সাধারণ পরিবার থেকে সেনাপ্রধান
১৯৬০ সালে ইসরায়েলে জন্ম নেওয়া আইজেনকটের পরিবার মরক্কো থেকে আসা মিজরাহি ইহুদি। নেতানিয়াহুর মতো অভিজাত পারিবারিক পটভূমি না থাকলেও সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
পদাতিক সেনা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন আইজেনকট। ২০২২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। তার দলের নাম ইয়াশার, যার অর্থ ‘সোজা’ বা ‘সৎ’।
দুর্নীতির অভিযোগমুক্ত ভাবমূর্তি, সাধারণ পারিবারিক পটভূমি এবং সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে নেতানিয়াহুবিরোধী ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসন, রাজনৈতিক বিতর্ক ও অস্থিরতায় ক্লান্ত ইসরায়েলিদের কাছে আইজেনকটকে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহ, বসতি সম্প্রসারণে সমর্থন
আইজেনকটের রাজনৈতিক অবস্থানের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থিত এই সমাধানের প্রতি তার স্পষ্ট সমর্থনের প্রমাণ নেই। বরং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তার বক্তব্যের বড় ধরনের বিরোধ রয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দুই জনগোষ্ঠীর জন্য দুটি রাষ্ট্র, এমন কথা আমি কখনো বলিনি। যারা এখনই শান্তি এবং দুই রাষ্ট্রের কথা বলেন, তারা এই সংঘাত বোঝেন না।’
তার বক্তব্যে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেয়ে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের আলাদা রাখার ধারণা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তার যুক্তি, এর মাধ্যমে ইসরায়েলে ইহুদিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। তবে সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার নিশ্চিত না করে বিচ্ছিন্নতার কথা বলা মূলত ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত করার কৌশল।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের প্রশ্নেও তার অবস্থান কঠোর। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘জুদেয়া ও সামারিয়ায় (পশ্চিম তীর) বসতি স্থাপনে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
২০২৬ সালের এপ্রিলে পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলে কয়েকটি বসতি ও অবৈধ আউটপোস্ট পরিদর্শন করেও সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
দাহিয়া ডকট্রিনের অন্যতম প্রণেতা, গাজা যুদ্ধেও বিতর্কিত ভূমিকা
আইজেনকটের সামরিক অতীতও বিতর্কের বাইরে নয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বহুল সমালোচিত ‘দাহিয়া ডকট্রিন’-এর অন্যতম প্রণেতা তিনি।
২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধে বৈরুতের দাহিয়া এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের অভিজ্ঞতা থেকে এই সামরিক নীতির নামকরণ করা হয়। এর মূল ধারণা হলো, কোনো এলাকা থেকে ইসরায়েলে হামলা হলে সেখানে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোতেও ব্যাপক ও অসম শক্তি প্রয়োগ করা হবে। ২০০৮ সালে আইজেনকট বলেছিলেন, ইসরায়েলে হামলা হলে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হবে।
২০২৬ সালের মার্চে লেবাননে আবারও এই নীতি প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এ ধরনের কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
২০১৮ সালে সেনাপ্রধানের দায়িত্বে থাকার সময় গাজায় ফিলিস্তিনিদের ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ বিক্ষোভ দমনে ইসরায়েলি সেনাদের প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের ঘটনাও ঘটে। ওই বিক্ষোভে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে অন্তত ১৮৯ ফিলিস্তিনি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৩৫ শিশু, তিন স্বাস্থ্যকর্মী ও দুই সাংবাদিক ছিলেন। আহত হন ছয় হাজারের বেশি মানুষ।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন বলেছিল, এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইন লঙ্ঘনের যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। কিছু ঘটনা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি অভিযান শুরুর পর নেতানিয়াহুর জোট সরকারে যোগ দেন আইজেনকট। তবে যুদ্ধের কৌশল নিয়ে মতবিরোধের কারণে ২০২৪ সালের জুনে তার দল ন্যাশনাল ইউনিটি জোট ছাড়ে।
গাজায় ‘পূর্ণ বিজয়’ অর্জন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের জীবনের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। যুদ্ধের সময় জিম্মিদের মরদেহ উদ্ধারের অভিযানে গিয়ে আহত হওয়ার পর তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল মেইর আইজেনকট মারা যান।
নেতানিয়াহুর বিকল্প, নাকি একই নীতির ভিন্ন মুখ?
আইজেনকটের জনপ্রিয়তার পেছনে তার রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি নেতানিয়াহুর প্রতি জনঅসন্তোষও বড় ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েলের অনেক ভোটার তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখছেন, যিনি রাজনৈতিক নাটকীয়তা ও সংঘাতের পরিবর্তে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা শাই বাজাকের মতে, আইজেনকটের বড় আকর্ষণ তার তুলনামূলক কম নাটকীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন একজন প্রভাবশালী ও আলোচিত নেতার শাসনের পর ইসরায়েলিরা এখন কম উচ্চকিত কাউকে চাইছেন। নতুন কোনো রাজনৈতিক নাটকীয়তার পরিবর্তে তারা শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আইজেনকটের প্রতি জনসমর্থনের আরেকটি কারণ হলো, সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান হিসেবে তার পেশাদার ভাবমূর্তি। অনেকের ধারণা, তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
তবে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক নীতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে আইজেনকটের উত্থান ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও ফিলিস্তিনিদের জন্য তা কতটা ইতিবাচক হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণে সমর্থন এবং সামরিক অভিযানে ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের পক্ষে অবস্থান তার রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফলে নেতানিয়াহুর বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে নীতিগত পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে, আইজেনকটের উত্থান নেতানিয়াহুবিরোধী ইসরায়েলিদের সামনে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু এই পরিবর্তন কি কেবল নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নেও নতুন পথ খুলবে? আপাতত তার অতীত বক্তব্য ও অবস্থান থেকে দ্বিতীয় সম্ভাবনা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেখা যাচ্ছে না।