ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়া এবং দল হিসেবে সেটিকে নিষিদ্ধ করার আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও কোনো ধরনের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হবে না। এটি তাদের দলের (বিএনপি) একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে পুলিশের প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
নির্বাহী আদেশে দল নিষিদ্ধ নয়
গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সরকার তাড়াহুড়ো করে বা কোনো নির্বাহী আদেশ জারি করে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। তাদের বিগত আমলের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণহত্যা নিয়ে নিবিড় তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হবে এবং এরপরই আদালতের মাধ্যমে আইনি বিচার শুরু হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার বিষয়টি তাদের দলের একটি অন্যতম নীতিগত সিদ্ধান্ত। আইনি প্রক্রিয়া ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা হবে, কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নয়।
শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের তৎপরতা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমরা তাকে (শেখ হাসিনাকে) দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে চাই। আমরাও চাই তিনি দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি হোন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, যেহেতু তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের নির্দেশনা রয়েছে, তাই সাজাপ্রাপ্ত বা অভিযুক্ত আসামি হিসেবে তিনি দেশে পা রাখামাত্রই তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে বিভিন্ন মহলের নানা বক্তব্য ও গুঞ্জনের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তিনি কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় ফেরার ঘোষণা দিচ্ছেন, তা আমাদের জানা নেই। তবে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান পরিষ্কার—আমরা সম্পূর্ণ আইনি পথ অবলম্বন করে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে তাকে দেশে ফেরত আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইনি প্রক্রিয়ায় যদি আপিল করার সুযোগ থাকে, তবে সেটিও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এইচএসসি পরীক্ষা ও শিক্ষার্থী আন্দোলন প্রসঙ্গে বক্তব্য
চলমান এইচএসসি পরীক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং প্রশ্নপত্রের ত্রুটি নিয়ে পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভের বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তটি হুট করে নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ, শিক্ষা বোর্ড এবং অংশীজনদের সাথে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমেই পরীক্ষার তারিখ ও সূচি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের জন্য বিশেষ বিবেচনা রাখা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিবেশের কারণে কেউ পরীক্ষা দিতে না পারলে, সেই পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্রের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভুল প্রশ্নপত্রের বিষয়ে একটি সুষ্ঠু তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তে যাদের গাফিলতি বা দায় পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের এই আশ্বাসে সাধারণ পরীক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট বলেও তিনি দাবি করেন।
‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা’
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি অপচেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একদল স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে। তারা দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চায়।
তবে এই ধরনের অপতৎপরতা নিয়ে সরকার শঙ্কিত নয় জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এসব উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড বা কথাবার্তা বলছেন, তারা সংখ্যায় অত্যন্ত নগণ্য। দেশের সাধারণ জনগণ বা শিক্ষার্থীরা তাদের সাথে নেই। তাই সরকার এসব বিচ্ছিন্ন বিষয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ বা গুরুত্ব দিচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
সচিবালয়ের এই অনুষ্ঠানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ বাহিনীকে জনগণের আস্থা অর্জন করে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও নিবেদিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।