যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সংঘাত এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিভিন্ন উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন দফায় তীব্র বিমান হামলা শুরু করেছে। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) অবরুদ্ধ করার ঘোষণা এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রণদামামা বাজছে।
তীব্র মার্কিন হামলা ও ইরানের প্রতিরোধ
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, ইরানের নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে তারা নতুন করে জোরালো হামলা শুরু করেছে। মার্কিন বাহিনীর এই হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্রুজ মিসাইল মজুত ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্বেশম দ্বীপ (Qeshm Island), বন্দর আব্বাস (Bandar Abbas), চাবাহার (Chabahar) এবং কিশ দ্বীপে (Kish Island) একের পর এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, এই হামলাগুলো হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং তাদের আক্রমণাত্মক সামরিক শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করার উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে।
ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় দক্ষিণ ইরানে অন্তত ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ইরানের সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বামপুর সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন হামলায় অন্তত ৭ জন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে ইরান সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র ও সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে, তারা কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের সফল হামলা চালিয়েছে।
বিশেষ করে কুয়েতের ,আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটি (Ali Al Salem Air Base) এবং আশ-শুআইবাহ (Ash-Shu’aybah) সামরিক জেটিতে, ইরান একযোগে ড্রোন ও সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের বাহিনী কুয়েতের আলি আল-সালেম ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান বাহিনীর স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র, আর্লি ওয়ার্নিং রাডার ব্যবস্থা, প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জ্বালানি ট্যাংক সফলভাবে ধ্বংস করেছে।
ইরান দাবি করেছে, খুজেস্তান প্রদেশে একটি বোতলজাত পানির কারখানা ও আহভাজে শিশুদের একটি ক্যান্সার হাসপাতালে মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই তারা কুয়েতের এই ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, তারা যেন তাদের ভূমি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন আগ্রাসন চালাতে না দেয়।
হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ ও ইরানের হুমকি
ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইব্রাহিম জোলফাগারি তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক বা অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে আঘাত করার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।
তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, যদি আমেরিকা এই ভুল করে, তবে এই অঞ্চলের সমস্ত মার্কিন সমর্থিত অবকাঠামো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ইস্পাতকঠিন আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। এমনভাবে সেগুলোকে ধ্বংস করা হবে যেন এগুলোর কোনো অস্তিত্বই কখনো ছিল না।
একই সাথে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কখনোই হরমুজ প্রণালীতে বহিরাগত বা অনাহুত মার্কিন হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না। জোলফাগারি একে ইরানের ‘অলঙ্ঘনীয় রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এই অশুভ ও উসকানিমূলক তৎপরতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী কোনোভাবেই উন্মুক্ত করা হবে না।
আলোচনার ব্যর্থতা ও সংঘাতের সূত্রপাত
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের সাথে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা ঘটে। গত মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি (MOU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পুনরায় দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা শুরু করা। কিন্তু তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে গোপনে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সেই শান্তি আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে গেছে।
গত সপ্তাহে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী অন্তত সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালালে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। এর জের ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপ করে এবং নতুন করে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ শুরু করে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি আলোচনা টেবিলে না ফেরে তবে আগামী সপ্তাহে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোতেও হামলা চালানো হবে।
ইরানের রহস্যময় ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ (Pickaxe Mountain) কী?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের রহস্যময় ও অতি-সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ (Pickaxe Mountain), যা ফার্সি ভাষায় ‘কুহ-ই কোলং’ (Kuh-e Kolang) নামে পরিচিত।
অবস্থান ও গুরুত্ব
ভৌগোলিক অবস্থান, এটি ইরানের ঐতিহাসিক ও প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ‘নাতানজ’ (Natanz) থেকে মাত্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে জাগ্রোস পর্বতমালায় অবস্থিত।
গোপন পারমাণবিক দুর্গ ২০২০ সাল থেকে ইরান এই পাহাড়ি অঞ্চলে গভীর সুড়ঙ্গ খনন করে বিশাল এক ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্স তৈরি করছে। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, ইরান এখানে অত্যন্ত গোপনে তাদের পারমাণবিক বোমার উপযোগী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও আধুনিক সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কারখানা স্থাপন করছে।
কেন এটি ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব?
এই পাহাড়ের নিচে খনন করা সুড়ঙ্গগুলো ভূপৃষ্ঠের শত শত ফুট গভীর গ্রানাইট পাথরের নিচে অবস্থিত। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন বিমান বাহিনীর বহুল আলোচিত এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ (Bunker Buster) বোমাও এই পর্বত ভেদ করে ভেতরের মূল কাঠামো ধ্বংস করতে সক্ষম নয়। ফলে এটি কার্যত বিমান হামলা প্রতিরোধী এক অভেদ্য দুর্গ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি এই স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেছেন, আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ধ্বংস করতে যাচ্ছি। ইরানকে প্রস্তুত থাকতে বলুন। যদিও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মাটির গভীরতম স্তরে অবস্থিত এই স্থাপনাটি নিষ্ক্রিয় করতে আকাশপথের চেয়ে স্থলবাহিনীর সরাসরি কমান্ডো অভিযান বা বিশেষ অন্তর্ঘাতমূলক (Sabotage) হামলা বেশি কার্যকর হতে পারে।
এক নজিরবিহীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট
এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি দুই পক্ষই এড়াতে চাইলেও পরিস্থিতি যেভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে এটি এক পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ইরান যদি তার ইয়েমেনি মিত্র হুতিদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীও অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ অবরুদ্ধ হয়ে যাবে, যা বিশ্ব সভ্যতার জন্য হবে এক চরম বিপর্যয়।