মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশেষে নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ২৩ তম রাষ্টপতি হলেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণের মাধ্যমে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ পেলেন তিনি।
আজ দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলে। ভোটগ্রহণ শেষে চলে গণনা। ভোট গণনায় দেখা যায়, ৩৪৯ ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি। এরমধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট আর অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
ভোটগ্রহণ পর্বের শুরুর দিকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরেই রাষ্ট্রপতি পদে ভোট প্রদান করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভোট দেওয়ার সময় সংসদে দলীয় সদস্যরা তাঁকে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান। এসময় জাতীয় সংসদে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যরা।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির মহাসচিব, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আজই তার শেষ দিন। আগামীকাল সন্ধ্যায় ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের কাছে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন তিনি। এর পর থেকেই সংসদে রাষ্ট্রপতির জন্য বরাদ্দকৃত আসন বা গ্যালারিতে বসবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এইদিকে আজ দুপুরে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ বলেন, শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মির্জা ফখরুলকে বলা হয় বিএনপির আলোকবর্তিকা। দলের চেয়ারপারসনের দীর্ঘ কারাভোগ-অসুস্থতা এবং ভাইস চেয়ারম্যানের প্রবাস জীবনের কঠিন সময়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (শিক্ষা ক্যাডারের) প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে একজন সফল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যান্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে, সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন, ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে আবার শিক্ষকতা পেশায় ফেরেন।
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল তার শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একইসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের মধ্যদিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ৫ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলটির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। সে থেকে আজ পর্যন্ত মহাসচিব হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি।
মির্জা ফখরুল ১৯৯১ সালে পঞ্চম ও ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচন করলেও দুটিতেই পরাজিত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নির্বাচন করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরের নভেম্বরে বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় প্রথমে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফখরুল ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হন। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন। বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তীকালে শপথ গ্রহণ না করায় নির্বাচন কমিশন তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে এবং সেখানে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন এবং নবগঠিত সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।বিএনপির পরীক্ষিত ও পরিশীলিত নেতা হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হলেন বিএনপির এই দীর্ঘদিনের কাণ্ডারী।
আগামীকাল শুক্রবার (২১ আগস্ট) দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।