রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০১:৩২ পূর্বাহ্ন
Title :
ঈদুল আজহার ছুটি একদিনে নামিয়ে আনলো পশ্চিমবঙ্গ অনিরাপদ খাবার ও অতিরিক্ত কীটনাশকে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট হস্তান্তর: শিশু রামিসা হত্যা জেট ফুয়েলের দামে বড় ছাড়, লিটারে কমলো কত? খাদ্যে বিষক্রিয়ায় শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি এক মাসের মধ্যে: প্রধানমন্ত্রী ব্যাংকিং খাতে এক তৃতীয়াংশ টাকাই পাচার হয়ে গেছে অরাজকতা সৃষ্টিকারীরা তলে তলে বিতাড়িতদের সঙ্গে আঁতাত করছে: তারেক রহমান ত্রিশালে ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী জুলাইকে আ. লীগের মতো সন্ত্রাস বলাদের চিনে রাখলাম: আসিফ মাহমুদ

ত্রিশালে ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

  • Update Time : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
  • ৫ Time View

হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দরিয়াপুরে ঐতিহ্যবাহী ও দীর্ঘদিনের মৃতপ্রায় ‘ধরোর খাল’ (যা স্থানীয়ভাবে বৈলার খাল নামে পরিচিত) পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। এই খাল পুনঃখননের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষি, সেচ ব্যবস্থা ও মৎস্য চাষে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে।

শনিবার বিকেলে ঢাকা থেকে সড়কপথে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। ওই সময় অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করলেও, তা উপেক্ষা করেই প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ধরোর খালের পুনঃখনন কাজের ফলক উন্মোচন করেন।

এরপর তিনি সরাসরি খালের তলদেশে নেমে যান এবং নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে এই ঐতিহাসিক খনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা করেন। মাটি কাটার পর তিনি খালের পাড়ে একটি পরিবেশবান্ধব তালগাছের চারা রোপণ করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম, স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান লিটন এবং ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

ত্রিশাল অঞ্চলের কৃষি বিপ্লবের ইতিহাসে এই ধরোর খালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্মারক। ১৯৭৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্থানীয় কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজস্ব উদ্যোগে এই ৩.১ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি খনন করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে এই খালটি দরিয়াপুর ও বৈলার অঞ্চলের হাজার হাজার একর ফসলি জমির পানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করত।

তবে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো ধরনের সংস্কার, পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি ধীরে ধীরে তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে এটি একটি প্রায় মৃত ও পরিত্যক্ত খালে পরিণত হয়।

খালের বুক জুড়ে পলি মাটি ও আগাছা জমে পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে তীব্র সেচ সংকটে পড়তেন স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকেরা। বর্তমান সরকার গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠন ও কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তারই অংশ হিসেবে শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক খালটিকে পুনরায় খনন করে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ দুপুর থেকেই ত্রিশাল ও এর আশপাশের এলাকায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আসে এবং একপর্যায়ে ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি শুরু হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের উদ্দীপনায় কোনো ভাটা পড়েনি। দুপুরের পর থেকেই হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু দরিয়াপুর এলাকায় খালের দুই পাড়ে এবং সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে সমবেত জনতা এবং দলীয় নেতা-কর্মীরা করতালি ও স্লোগানে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। খালের পাড়ে গাছের চারা রোপণ ও খননস্থল পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী খালের পাশেই নির্মিত একটি অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সুধীজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন।

এ সময় স্থানীয় প্রান্তিক কৃষক, গ্রামীণ নারী ও শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রিয় নেতাকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে সাধারণ মানুষ বারবার হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।

কৃষি ও পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ধরোর খালটি পুনঃখননের ফলে ত্রিশাল উপজেলার একটি বিশাল অংশের কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ: খালের নাব্যতা ফিরে এলে শুষ্ক মৌসুমে শত শত হেক্টর জমিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে। খালের জমানো পানি দিয়ে কৃষকেরা স্বল্প খরচে বোরো ও আমন ধানসহ বিভিন্ন রবিশস্য চাষ করতে পারবেন।

জলাবদ্ধতা নিরসন: বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত এই খালের মাধ্যমে নেমে যেতে পারবে, যার ফলে দরিয়াপুর ও বৈলার অঞ্চলের ফসলি জমি এবং ঘরবাড়ি প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

দেশীয় মাছের চাষ ও জীবিকা: খালটিতে বছরজুড়ে পানি প্রবাহ থাকলে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ ও আহরণ করতে পারবেন, যা এই অঞ্চলের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে খালের দুই পাড়ে যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে (যার সূচনা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর তালগাছ রোপণের মাধ্যমে), তা অঞ্চলের বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে।

সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৃষি খাতের স্বয়ম্ভরতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন করতে হলে সবার আগে গ্রামের উন্নয়ন করতে হবে, কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে প্রথম সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন, সেই ধারাকে বর্তমান সরকার আরও বেগবান করবে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মৃতপ্রায় নদী ও খাল পুনরুজ্জীবিত করে কৃষকের দোরগোড়ায় সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে।

তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেন যাতে খালের পুনঃখনন কাজ অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়। একই সাথে খালের পানি যাতে সাধারণ কৃষকেরা কোনো বাধা ছাড়াই সমবায়ের ভিত্তিতে ব্যবহার করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

ত্রিশালের স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রবীণ কৃষকেরা সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। ৭৯ সালে শহীদ জিয়ার খাল খনন স্বচক্ষে দেখেছিলেন এমন কয়েকজন বয়োবৃদ্ধ কৃষক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, জিয়াউর রহমান এই খাল কেটে আমাদের বাঁচিয়েছিলেন। আজ তার ছেলে তারেক রহমান এসে আবার এই মরা খাল সচল করছেন। আমাদের আর পানির জন্য হাহাকার করতে হবে না।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান লিটন এবং জেলা পরিষদ প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স তাদের বক্তব্যে এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ সফরের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং প্রকল্পের নিয়মিত তদারকির আশ্বাস দেন।

বিকেল শেষে প্রধানমন্ত্রী তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সফর শেষ করে আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ধরোর খালের এই পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ময়মনসিংহের কৃষি মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, যা আগামী দিনগুলোতে অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category