ভারতের মণিপুরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে চলমান বিরোধ নতুন করে সহিংস রূপ নিয়েছে। নাগা, কুকি ও জো সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে রাজ্যের পাহাড়ি জেলাগুলোতে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়ছে চাপ এবং মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
মণিপুরে সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী মেইতেই সম্প্রদায়ের অধিকাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। অন্যদিকে পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। ভূমি, জাতিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে এসব সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছে।
২০২৩ সালের মে মাসে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিকে ঘিরে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই সময় কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সহিংসতার কারণে অন্তত ৬০ হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাংখুল নাগা এবং কুকি-জো উপজাতির মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে রাজ্যের প্রায় সব পাহাড়ি জেলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুরোনো বিরোধের পাশাপাশি নতুন করে অবিশ্বাস ও বৈরিতাও বাড়তে শুরু করেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তাংখুল নেতাদের দাবি, জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকেই সাম্প্রতিক সংঘাতের সূত্রপাত। অন্যদিকে কুকি নেতাদের অভিযোগ, কুকি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চলমান আলোচনাকে কেন্দ্র করে নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সংঘাতের কারণে গত কয়েক মাসে বহু গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কুকি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গুঁড়ো দুধ, চাল, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রীর সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, তারা কার্যত এক ধরনের মানবিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছেন এবং পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে সংকট আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এদিকে চলমান অচলাবস্থার কারণে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে রোগীর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শয্যার অভাবে রোগীদের বারান্দা ও হাসপাতালের প্রবেশপথেও অবস্থান করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে টাইফয়েড, ডেঙ্গু এবং বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
মণিপুরের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন ত্রাণশিবির ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত ৭৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, পুষ্টির ঘাটতি, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং প্রয়োজনীয় মৌলিক সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার কারণেই এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।