বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০৩:২১ পূর্বাহ্ন

হরমুজ প্রণালীতে দুই তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ভয়াবহ আগুন

  • Update Time : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ Time View

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত এক চরম ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে। টানা দশম রাতের মতো মার্কিন সামরিক বাহিনীর চালানো তীব্র বোমার বর্ষণের প্রতিশোধ হিসেবে ইরান তাদের সামরিক কৌশল আরও আগ্রাসী করেছে।

মঙ্গলবার ভোরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেগুলোতে ভয়াবহ দাবানলের মতো আগুন ধরে যায়। একই সময়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলসহ জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও তাদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে সংকট ও ট্যাঙ্কারে অগ্নিসংযোগ

আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে দেওয়া এক জরুরি বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণাংশে তথাকথিত ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ পথ’ ব্যবহার করে অতিক্রম করার চেষ্টাকালে দুটি বৃহদাকার জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার বাণিজ্যের ওপর আঘাত হানা হয়। এই ঘটনার ফলে জাহাজ দুটিতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায় এবং নৌযান দুটি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।

আইআরজিসি-র বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের উস্কানিমূলক আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে এবং এই রুট ব্যবহারকারী যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে সরাসরি ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হবে।

যুক্তরাজ্যের নৌ বাণিজ্য অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে আক্রমণের শিকার হওয়া একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার থেকে নাবিকদের জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রণালীটি বিশ্ববাজারের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত। বৈশ্বিক খনিজ তেল ও প্রাকৃতির গ্যাসের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায়, প্রণালীটি অবরুদ্ধ হওয়ার খবরের পরপরই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতের নিরাপত্তায় চরম ধস নেমেছে।

জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে সমন্বিত হামলা

মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে এবার কৌশলগত পাল্টাহামলা চালাচ্ছে তেহরান। কুয়েতের আরিফজান ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের হাইমার্স (HIMARS) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে ভূগর্ভস্থ সারফেস-টু-সারফেস ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। অন্যদিকে, জর্ডানের আকাশসীমায় একাধিক আত্মহত্যাপ্রবণ ড্রোন ও ব্যালেস্টিক মিসাইল প্রবেশের পর দেশটির সামরিক বাহিনী সেগুলো আকাশেই ভূপাতিত করার দাবি করেছে, যদিও এতে বেশ কয়েকটি ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাহরাইনের রিফা অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ৫ নম্বর নৌবহরের অবকাঠামো এবং ‘প্যাট্রিওট’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে আইআরজিসি। আঞ্চলিক যুদ্ধ ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অক্ষশক্তিগুলোকেও জড়িয়ে ফেলছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরাও একই সাথে সৌদি আরবের ওপর অবরুদ্ধ সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা (Maritime Blockade) জারির ঘোষণা দিয়েছে।

মার্কিন হামলা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে যে, তাদের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালী পুনরায় চলাচলের উপযুক্ত করতে ইরানের সামরিক ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, হরমুজ উপকূলীয় পর্যবেক্ষণ ঘাঁটি এবং কমাণ্ড সেন্টারগুলোতে ১০ম দিনের মতো বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়েছে। পেন্টাগনের প্রকাশিত তথ্যমতে, জর্ডানে সাম্প্রতিক ইরানি হামলায় দুই মার্কিন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।

সামরিক উস্কানি চরমে পৌঁছালেও পর্দার আড়ালে কিছুটা কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুদ্ধবিরতি ও সংকট উত্তরণের নতুন প্রস্তাব নিয়ে প্রতিবেশ মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানে পৌঁছেছেন। তবে তেহরান জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসন এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেআইনি নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই সর্বাত্মক সংঘাত থামবে না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category