শিক্ষার্থীদের ওপর ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগের ঘটনায় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগ দাবি করেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তার এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রাহুল গান্ধীর লোকসভায় দেওয়া বক্তব্য শেয়ার করে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে জবাব দিতে হবে।
এর আগে লোকসভায় একটি সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, গত ২০ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং ছররা গুলি ব্যবহারের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শরীরে ছররা গুলি লাগার ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায় এড়াতে পারেন না এবং তাকে পদত্যাগ করতে হবে।
রাহুল গান্ধী আরও বলেন, যদি অমিত শাহ দাবি করেন যে ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না, তাহলে তিনি দায়িত্ব পালনে অযোগ্য। আর যদি তার নির্দেশেই এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তিনি সরাসরি দায়ী। দুই পরিস্থিতিতেই তার পদে থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
লোকসভায় দেওয়া বক্তব্যে রাহুল অভিযোগ করেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর রয়েছে। তিনি দাবি করেন, সংসদ ভবনে অমিত শাহর গাড়িবহর দেখা গেলেও তাকে অধিবেশনে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি।
রাহুলের অভিযোগ, ছররা গুলির ঘটনায় একজন শিক্ষার্থী দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং সারাজীবনের জন্য অন্ধ হয়ে যেতে পারেন। এ ঘটনার জবাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাহুলের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, ২০ জুলাই পুলিশের পদক্ষেপে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ওই দিনের ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখানো প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে রাহুল গান্ধীর অভিযোগের বিরোধিতা করেছে সরকারপক্ষ। সংসদীয়মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রশ্ন তোলেন, ছররা গুলি ব্যবহারের নির্দেশ অমিত শাহ দিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে রাহুলের কাছে কোনো প্রমাণ আছে কি না। তিনি রাহুলের বক্তব্যকে অধিকারভঙ্গের সঙ্গে তুলনা করে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান এবং বিতর্কিত বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রেখে কেন্দ্রীয় সরকারের আনা সংশোধনী বিল বুধবার রাতে লোকসভায় কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি পাসের সময় বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
পরে সংবাদ সম্মেলনেও রাহুল গান্ধী একই অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করে অমিত শাহর পদত্যাগ দাবি করেন। এর পরই সিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে তার দাবির প্রতি সমর্থন জানায়।
ছররা গুলি ব্যবহারের বিষয়ে সিআরপিএফের মহাপরিচালক জ্ঞানেন্দ্র প্রতাপ সিংও বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এর সব দায় ও জবাবদিহি তিনি গ্রহণ করবেন।
ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে র্যাফের বিরুদ্ধে। র্যাফ সিআরপিএফের অধীন হলেও দিল্লি পুলিশের নির্দেশনায় কাজ করে। দুটি বাহিনীই ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। বিশ্লেষকদের মতে, সিআরপিএফ প্রধানের বক্তব্যের মাধ্যমে অমিত শাহকে দায়মুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থী আন্দোলন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে লিখিত সমঝোতা হলেও বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সিজেপি। দলটি জানিয়েছে, এসব বন্ধ না হলে তারা আবারও আন্দোলনে নামবে।
কয়েকটি রাজ্য সরকার গ্রেপ্তার হওয়া আন্দোলনকারীদের মুক্তির নির্দেশ দিলেও অন্য কিছু রাজ্যে নতুন করে ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে চাপে রাখতে শিক্ষার্থী, কৃষক, যুবসমাজ ও নতুন প্রজন্মের পেশাজীবীদের নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সিজেপি।
এই লক্ষ্যেই সম্প্রতি দলটির নেতারা উত্তর ভারতের কৃষক নেতা রাকেশ সিং টিকায়েতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষার্থী, কৃষক ও তরুণদের একত্র করে পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।
এর আগে দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা আন্দোলনেও কৃষক সংগঠনের নেতারা অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা জানান, কৃষক নেতাদের সঙ্গে তাদের আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে এবং ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।