বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন

ফুটপাতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০২৩
  • ৮১ Time View

দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলায় যখন হিমশিম খাচ্ছে সরকার তখনো বিদ্যুৎ চুরি ঠেকানোর বিশেষ উদ্যোগ নেই। সংকটেও হরহামেশাই চুরি হচ্ছে বিদ্যুৎ। বিদ্যুতে ঘাটতি মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এত উদ্যোগ নেয়ার পরও ঠেকানো যাচ্ছে না বিদ্যুৎ চুরি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ফুটপাত-দোকান-পাটে অবৈধ সংযোগের নামে চলছে বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব।

ডিপিডিসি কর্মকর্তারা জানান, এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নে লাইনম্যান, ইঞ্জিনিয়ার এবং টাস্কফোর্স প্রতিনিয়ত এসব এলাকা মনিটরিং করছে। গুলিস্তানের এক ব্যবসায়ী আমার সংবাদকে বলেন, সন্ধার পর থেকে মাত্র তিন ঘণ্টা দোকান খোলা রাখতে পারি। এরপরই দোকান বন্ধ করতে হয়। এই তিন ঘণ্টার জন্য একটি লাইট ব্যবহার করি। এতে প্রতিদিন ৩০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। পল্টন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিকেলের পর থেকেই জ্বলছে বিদ্যুতের বাতি। এসব দোকানে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দিনের বেলা সূর্যের আলোতেও জ্বলছে বৈদ্যুতিক ভাল্ব। সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ১৬৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফুটপাত। এসব ফুটপাতে সন্ধ্যা হলে লাখ লাখ বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বলে ওঠে। চলে রাত ১১টা পর্যন্ত।  অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফুটপাতের বেশির ভাগ সংযোগই অবৈধ। তবে  কিছু কিছু বৈধ সংযোগও রয়েছে। অবৈধ সংযোগের জন্য ঢাকার কয়েকটি এলাকায় দালাল নিয়োগ করা আছে। তারাই নিজ নিজ এলাকার ফুটপাতের বৈদ্যুতিক সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ জন্য তাদেরকে কয়েকগুণ বেশি টাকা দিতে হয়। যেমন— একটি ২০ ওয়াটের এনার্জি সেভিং বাল্ব রাতে পাঁচ ঘণ্টা জ্বললে মাসে ২০০ টাকার বেশি বিল হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ফুটপাতে জ্বালানোর জন্য প্রতিদিন দিতে হয় বাল্বপ্রতি ৩০ টাকা। অর্থাৎ মাসে ৯০০ টাকা। এই বাড়তি টাকা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট দালাল, প্রভাবশালী, বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় মাস্তানদের পকেটে।

রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল, গুলিস্তান ও জুরাইন, মহাখালী, মিরপুর এলাকার ফুটপাতের হকারদের সাথে কথা বললে কয়েকজন হকার জানান, মিটার আছে কি নাই তা তাদের জানা নাই। বাল্বপ্রতি ৩০ টাকা করে তারা প্রতিদিন বিল দেন। রাস্তার হকাররা একটি এবং ফুটপাতের হকাররা তিনটি থেকে পাঁচটি লাইটও ব্যবহার করেন। দালালকে সেই হিসাবেই টাকা দিতে হয়।

রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বর, সোনালী ব্যাংকের পেছনে, আলিকো ভবন থেকে মধুমিতা সিনেমা হল, দৈনিক বাংলা মোড় থেকে ফকিরেরপুল, বিমান অফিসের আশেপাশে, রাজউক ভবনের সামনে, সড়ক ভবনের সামনে ও স্টেডিয়ামের গেটের দুদিকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় কয়েক হাজার দোকান বসে। এসব দোকানে সন্ধ্যা হলেই হাজার হাজার বাল্ব জ্বলে। দোকানগুলোর আশপাশের মেইন লাইন থেকে বৈদ্যুতিক সংযোগ নেয়া। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছে একেক ব্যক্তি। গুলিস্তান এলাকায় প্রায় তিন হাজার সংযোগের মালিক নুরু নামের এক ব্যক্তি। মাসিক আয় কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা। এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে সে এখন কোটিপতি। তার পক্ষ হয়ে কাজ করে মতিঝিল এলাকার কয়েকজন লাইনম্যান। তারাই নামমাত্র কয়েকটি মিটার দেখিয়ে সেখানে মাস শেষে কয়েক হাজার টাকা বিল জমা দেয়।

ঢাকায় বিদ্যুৎ বিতরণে পর্যায়ক্রমে কয়েকটি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা গঠিত হলেও বন্ধ হয়নি সিস্টেম লস। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) থেকে প্রথমে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় গঠিত হয় ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই অথরিটি (ডেসা)। পরে অনিয়মের মুখে পড়ে বিলুপ্ত হয় ডেসা। গঠিত হয় ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লই কোম্পানি (ডেসকো) এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। বিদ্যুতের গ্রাহকদের অভিযোগ, দুটি বিতরণ কোম্পানি থেকে তারা আশানুরূপ সেবা পাচ্ছেন না। পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। নতুন সংযোগ পেতে অসাধু কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, এ খাতে সিস্টেম লসের কারণে অপচয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০১০-১১ সালে বিদ্যুৎ খাতে সামগ্রিকভাবে বছরে গড় সিস্টেম লস ছিল ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে এটি কমে ১১ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে সঞ্চালন লাইনে ক্ষতি হয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এদিকে মিটারে এসিড দিয়ে অভিনব পদ্ধতির বিদ্যুৎ চুরির ঘটনাও ঘটছে বিভিন্ন জায়গায়। এর আগে বিদ্যুৎ চুরির এমন ঘটনায় সাড়ে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে।

স্পেশাল টাস্কফোর্সের এক কর্মকর্তা জানান, মিটার ছিদ্র করে তাতে এসিড স্প্রে করে করে মিটারের সার্কিট বিনষ্ট করা হয়েছে। এতে যাতে মিটারটির ডিসপ্লে বন্ধ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান বলেন, অবৈধ এসব সংযোগ বন্ধে আমরা তৎপর। তবে কিছু অসাধু লোক আছে, তারা এসব করছে। তাদের পেছনে আমরা আছি। শুধু রাজধানীতেই নয়, বেশির ভাগ জেলা শহরের একই চিত্র।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category