সরকারি স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে আমাজনের ৩২২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বন ধ্বংস করা হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ৬২ শতাংশ বেশি। আর রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে আগের ফেব্রুয়ারি মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর শাসনামলে ব্যাপক বন নিধন হয়েছে। কোনো কোনো রিপোর্ট মতে, তার আমলে আমাজন নিধন গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। তার সরকারের অধীনে বন নিধনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছিল।
গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আমাজনে অবৈধভাবে গাছ কাটার ইতি ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন বিরোধী নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা। নির্বাচিত হওয়ার পর চলতি বছরের শুরুতে (১ জানুয়ারি) প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি।
‘পৃথিবীর ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত আমাজনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই অবস্থিত ব্রাজিলে। দায়িত্ব নেয়ার পরই বন নিধন বন্ধের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেন প্রবীণ এ রাজনীতিক। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভার দেন পরিবেশবিদ মেরিনা সিলভার ওপর। মেরিনা লুলার আগের মেয়াদেও পরিবেশমন্ত্রী ছিলেন। সেই সময় বন নিধন ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল।
দায়িত্ব পাওয়ার পর আমাজন রক্ষায় পরিবেশমন্ত্রী মেরিনা ‘আমাজন ফান্ড’ নামে একটি তহবিল চালু করেছেন। শুধু তাই নয়, পরিবেশ বিষয়ক সিভিল সোসাইটি কাউন্সিল সক্রিয় করেছেন। বলসোনারোর সময় এ দুটো বিষয়ই অকার্যকর করা হয়েছিল।
এছাড়া প্রায় দুই দশক আগে সফল হওয়া বন উজাড় প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক একটি পরিকল্পনা নবায়ন করেছেন অভিজ্ঞ এ মন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ এসব পদক্ষেপের ফলে প্রথম মাসেই আমাজন বন উজাড় ৬১ শতাংশ কমে যায়।
ব্রাজিল সরকারের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইনপের স্যাটেলাইটের সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে ১৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বন ধ্বংস করা হয়। যা গত বছরের জানুয়ারি মাসের চেয়ে ৬১ শতাংশ কম। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৪৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বন নিধন করা হয়।
কিন্তু প্রথম মাসে কমলেও দ্বিতীয় মাসেই বন উজাড়ে রেকর্ড হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, লুলার প্রথম মাসে বন উজাড়করণের হার একটি ভালো দিক হলেও উগ্রপন্থি রাজনীতিক বলসোনারোর আমলে আমাজনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণে অনেক সময় লাগবে।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড ফর ন্যাচারের (ডব্লিউডব্লিউএফ) ব্রাজিল শাখার সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল সিলভা জানান, ‘জানুয়ারিতে গাছ কাটার হারের এই পতন একটি ইতিবাচক দিক। তবে গাছ কাটার যে ট্রেন্ড চলছিলো তা পুরোপুরি উল্টে গেছে তা এখনই বলা যাবে না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাজন বন রক্ষা করতে হলে নতুন নতুন উদ্ভাবন প্রয়োজন। যেমন বলছেন গ্রিনপিস ব্রাজিলের মুখপাত্র রোমুলো বাতিস্তা। লুলার সরকার ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বন উজাড় থামাতে নতুন উদ্ভাবনের প্রয়োজন। কারণ আমাজন বর্তমানে ১০ কিম্বা ২০ বছর আগের অবস্থায় নেই।’
ডব্লিউডব্লিউএফ-ব্রাজিল দেখিয়েছে, সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে গাছ কাটার পরিমাণ বেড়ে যায়, যেটি শুরু হয় জুন মাসে। প্রতিষ্ঠানটির আরেক বিশেষজ্ঞ ফ্রেডেরিকো মাকাডো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার নেতৃত্বে নতুন করে ফেরার জন্য ব্রাজিলকে খুব দ্রুত বন উজাড় এবং দাবানল নিষিদ্ধকরণ ও নিয়ন্ত্রণ করার অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে।’
বলসোনারোর আমলে ব্যাপকহারে বেড়ে যায় বন উজাড়। কমতে থাকা ব্রাজিলের আমাজন অংশে আরও মাইনিং তথা খনিখনন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের দিকে জোর দিয়েছিলেন তিনি। পরিবেশবাদী ও আদিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাজনের বন ধ্বংস ও সোনা মাইনিং করা বা আদিবাসীদের ওপর অত্যাচারের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জন্য বলসোনারো প্রশাসনের নীতিকে দায়ী করে।
এর আগেও ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন লুলা। প্রায় ১২ বছর পর আবারও ক্ষমতায় ফিরেছেন তিনি। লুলা প্রতিজ্ঞা করেছেন, আমাজনে গাছ কাটার হার একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনবেন।