সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৬ অপরাহ্ন
Title :
দক্ষিণ আফ্রিকায় একের পর এক নারীর মরদেহ, বাড়ছে সিরিয়াল কিলারের আতঙ্ক ছাত্র আন্দোলনের চাপে পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ভুচিচ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে ‘সামনে একটি সাপ ও একটি জামায়াত এলে আগে জামায়াত সম্পর্কে সাবধান হতে হবে’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘাতের জন্য প্রস্তুত ইরান: আব্বাস আরাগচি আইফোন হাতিয়ে নিতেই অপ্রতিম হত্যা, সাত দিন আগে হয়েছিল পরিকল্পনা: তিন আসামির জবানবন্দি শিগগিরই জ্বালানি সংকট কেটে যাবে: জ্বালানিমন্ত্রী গাজাসহ ফিলিস্তিনে ১ কোটি মানুষের খাবারের ব্যবস্থা আরব আমিরাতের হাম উপসর্গে একদিনে আরও ৯ জনের মৃত্যু রাড্ডায় ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আইফোন হাতিয়ে নিতেই অপ্রতিম হত্যা, সাত দিন আগে হয়েছিল পরিকল্পনা: তিন আসামির জবানবন্দি

  • Update Time : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ Time View

কুমিল্লার ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা ঘটনার সাত দিন আগেই করা হয়েছিল বলে আদালতে দেওয়া তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। আইফোনের প্রতি লোভ থেকেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে তার আইফোন নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয় তাকে। পরে তার মৃত্যু হয়।

কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিনটি জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তার বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক করার জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

তুহিনের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানেই অপ্রতিমের আইফোন নেওয়া এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য, ‘তুহিন আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে মারার প্ল্যান করে।’

অন্য কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার বন্ধু তাকে পরিকল্পনার কথা জানায়। তাকে বলা হয়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

তিন জবানবন্দির এই অংশে একটি মিল পাওয়া যায়। হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি। আইফোনকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তিনজনের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকে অপ্রতিমকে বার্তা পাঠান। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

তুহিনের বর্ণনায় আরও এসেছে, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। তাদের ছবি তোলার কথা ছিল। ছবি তোলার এই পরিচয়কেই কাজে লাগিয়ে অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে তিন আসামির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়েছেন তুহিন। এরপর তাকে ‘বুদ্ধি দিয়ে’ সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তিনি। জায়গাটি নির্জন এবং এটি তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তুহিন।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।

তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও প্রায় একই। সে জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায় এবং সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।

চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয় বলেও তিন জবানবন্দিতে প্রায় একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের বর্ণনা রয়েছে। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সেটি আর ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশও আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই তাকে মারধর করা হয়।

তিন আসামির জবানবন্দিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। প্রথমে তাকে একটি থাপ্পড় মারেন তিনি। এরপর পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। পরে অন্য দুজনকে মারতে বলেন।

দোকানে কর্মরত কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। তৃতীয় কিশোরও বলেছে, তুহিনই প্রথম ওই হাতল দিয়ে অপ্রতিমকে আঘাত করেন।

তিন জবানবন্দিতে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও মিল পাওয়া গেছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল।

দ্বিতীয় কিশোর তার জবানবন্দিতে বলেছে, ‘আমাদের প্ল্যান ছিল, তুহিন ওই মোবাইল বিক্রি করে আমাকে টাকার ভাগ দিবে। এই জন্যই এই কাজ করা।’

তৃতীয় কিশোরও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। তার ভাষ্য, আইফোনটি বিক্রি করে তাকে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

তবে অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আসামিরা কে কোথায় ছিল, সে বিষয়ে তিন জবানবন্দিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। দ্বিতীয় জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়, আর তুহিন তখন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে যান।

তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল বলে তিন আসামির জবানবন্দিতেই উল্লেখ রয়েছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও তথ্য এসেছে। তুহিনের ভাষ্য, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে সব ঘটনা জানান। হত্যার পরিকল্পনার কথা সিয়াম আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে অবশ্য হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা নেই। পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।

পুলিশের ভাষ্য, সিয়াম সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছিল, হত্যার দিন রাতেই তুহিন তার সঙ্গে দেখা করে হত্যার বিস্তারিত জানান।

জবানবন্দিতে হত্যার পরদিনের ঘটনাও উঠে এসেছে। তুহিন বলেছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

অন্য কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়। এরই মধ্যে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানায়, তাদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

তিন আসামির জবানবন্দি পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে অপ্রতিমের সঙ্গে তাদের পরিচয়, আইফোনের প্রতি লোভ, আগে থেকে পরিকল্পনা, নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন নেওয়া এবং এরপর হামলার ঘটনাপ্রবাহে বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেকের ভূমিকা কতটা ছিল, তার চূড়ান্ত নির্ধারণ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে হবে।

অপ্রতিমের পরিবার, সহপাঠী ও কুমিল্লার মানুষ এখন ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের অপেক্ষায়। ছবি তোলার কথা বলে যে বিকেলে বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম, সেই বিকেলের ঘটনার পুরো সত্য সামনে আসাই এখন স্বজনদের প্রধান প্রত্যাশা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category