মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলা যুদ্ধ এক আশঙ্কাজনক ও ধ্বংসাত্মক মোড়ে এসে পৌঁছেছে। ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে উভয় পক্ষের আকাশসীমা ও সামরিক স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি জোরালো হামলা শুরু হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘অত্যন্ত কঠোরভাবে, আঘাত করার হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে যে তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যেকোনো নতুন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত ও কঠোর পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছে। এদিকে কুয়েত সীমান্তের ভেতরে ইরানের ড্রোন হামলা এবং লোহিত সাগরে হুথিদের নৌ চলাচলে বাধার ঘটনায় সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরো প্রকট রূপ ধারণ করেছে।
ক্যাম্প ডেভিডে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাপ্তাহিক ক্যাবিনেট বৈঠক শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানকে সমঝোতার টেবিলে ফেরাতে সামরিক চাপ বহুগুণ বাড়ানো হবে।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আমরা কেবল বিজয় চাই। আমরা এমনভাবে তাদের আঘাত করতে যাচ্ছি যে একপর্যায়ে তারা বাধ্য হয়ে বলবে, আর সহ্য করা সম্ভব নয়। ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে ইরান যতই দীর্ঘ সময় সংঘাতে জড়িয়ে থাকবে, তাদের শাসনব্যবস্থা ততই দুর্বল ও ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লেভিট মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সংকেত দিয়ে জানান যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি সংক্রান্ত পূর্বের প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক ভেঙে দিয়েছে ইরান। বিশেষ করে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং মার্কিন সেনাদের নিশানা করেছে। ফলস্বরূপ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ধরনের হামলার বিরুদ্ধে চুপ করে থাকবেন না এবং ইরানকে এর মূল্য দিতেই হবে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মুখে তেহরানও পিছিয়ে না থাকার দৃঢ় বার্তা দিয়েছে। ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম-কে উদ্ধৃত করে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন ও ইসরায়েলি কৌশলগত ঘাঁটি ও অবকাঠামো এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুর আওতায় রয়েছে।
ইরানের সামরিক নেতৃত্বের মুখপাত্রদের মতে, মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত জ্বালানি ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলার পরিকল্পনার খবরকে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রতিহত করতে প্রস্তুত। দেশটির কৌশলগত পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত গোপনীয় সামরিক অবকাঠামো ও ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ (Pickaxe Mountain)-এর মতো সুরক্ষিত ঘাঁটিগুলো থেকে যেকোনো মুহূর্তেই বহুমুখী পাল্টা হামলা চালানো হতে পারে বলে সংকেত দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাকের জোরকাদর মার্কিন নৌ-অবরোধের কড়া সমালোচনা করে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এই অব্যাহত আগ্রাসন কেবল হরমুজ প্রণালীই নয়, বরং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রণালী ও কৌশলগত চ্যানেলগুলোকেও সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলবে। বিশ্ব অর্থনীতি, শক্তি বাজার এবং স্বয়ং মার্কিন করদাতাদের এই যুদ্ধবাজ নীতিগুলোর চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়ার মধ্যে শুক্রবার কুয়েত সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন সফলভাবে ধ্বংস করেছে।
কুয়েত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কর্নেল সৌদ আব্দুলআজিজ আল-আতওয়ান এক বিবৃতিতে জানান, কুয়েতের আকাশসীমায় ভোর থেকে কয়েকটি সন্দেহভাজন ইরানি ড্রোন শনাক্ত করা হয়। ড্রোনগুলো দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল। তবে সময়োপযোগী পদক্ষেপে কুয়েতি প্রতিরক্ষা বাহিনী সেগুলোকে আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
আকাশে ড্রোন ধ্বংসের ফলে ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষের কারণে কিছু অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে তারা কুয়েতে অবস্থিত আহমেদ আল-জাবের বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন কৌশলগত কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছিল।
উপসাগরীয় উত্তেজনার আঁচ পৌঁছেছে লোহিত সাগর ও বাবেল মান্দেব প্রণালীতেও। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা জানিয়েছে, তারা অন্তত ৮টি সৌদি বাণিজ্যিক জাহাজকে জোরপূর্বক তাদের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে।
যদিও এই অভিযানের নির্দিষ্ট সময়সীমা হুথিদের পক্ষ থেকে সরাসরি বিস্তারিত করা হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোতে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, বর্তমানে বিশটিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এই সামুদ্রিক করিডোরগুলোকে সচল রাখতে এবং ইরানের সামুদ্রিক ব্লকেড ভাঙতে পাহারা দিচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পূর্বে যেখানে দৈনিক প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করত, সেখানে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যাতায়াত আশঙ্কাজনক হারে কমে নেমে এসেছে। এর সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে খোদ ওয়াশিংটনেও তীব্র রাজনৈতিক মতভেদ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সিনেটে সামরিক ক্ষমতা সীমিতকরণ বিষয়ক একটি প্রস্তাব ৪৯-৫০ ভোটে মাত্র ১টি ভোটের ব্যবধানে বাতিল হলেও ক্যাপিটল হিলে যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে বিরোধিতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ইতিমধ্যে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে একাধিক রেজুলেশন পাস হয়েছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সাধারণ মার্কিন নাগরিক মনে করছেন যে দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জন্য চরম ক্ষতিকর রূপ নিচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যস্ফীতি এবং সামরিক বাজেটের অস্বাভাবিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সামরিক পদক্ষেপ নিলেও কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক বা কৌশলগত সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। উভয় পক্ষই যখন কঠোর অবস্থানে স্থির, তখন মধ্যপ্রাচ্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।